ঢাকা ০১:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

রাডার জরিপে মানবসৃষ্ট কাঠামো, বাড়ছে নূহের নৌকা নিয়ে কৌতূহল

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:১৪:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / 24

ছবি: সংগৃহীত

তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশনে নতুন ভূগর্ভস্থ রাডার জরিপে কিছু অস্বাভাবিক কাঠামোর সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে ‘নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস’। গবেষণা সংগঠনটির দাবি, রাডারে পাওয়া সরলরেখা, কোণাকুণি সংযোগ, স্তরবিন্যাস ও সম্ভাব্য ফাঁকা জায়গাগুলো প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠনের বদলে কোনো মানবসৃষ্ট কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তবে এ দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি এবং গবেষণাটি পিয়ার-রিভিউডও নয়।

জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই জরিপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দুরুপিনার রহস্য আবারও আলোচনায় এসেছে। পাহাড়ের ঢালে নৌকার মতো দেখতে অস্বাভাবিক এই আকৃতি বহু বছর ধরেই গবেষক ও অনুসন্ধানকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

নতুন জরিপে প্রকৌশলী ড. খসরো বাখতারের তৈরি ‘বাখতাররাডার’ নামের একটি ভূগর্ভস্থ ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানসের দাবি, রাডার স্ক্যানে কয়েকটি সরলরেখা, কোণাকুণি সংযোগ, স্তরবিন্যাস এবং সম্ভাব্য ফাঁকা অংশ শনাক্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন  ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকায় বসা নিয়ে দ্বন্দ্ব: সহযাত্রীর ঘুষিতে১ জনের মৃত্যু

গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব বৈশিষ্ট্য সম্ভাব্য করিডর, কক্ষ কিংবা কাঠামোর ভেতরের একাধিক স্তরের অংশ হতে পারে। তাদের দাবি, বৈশিষ্ট্যগুলোকে শুধু স্বাভাবিক শিলার অস্বাভাবিকতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে একই কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ড. বাখতার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, কয়েক দশকের কর্মজীবনে তিনি এমন অস্বাভাবিকতা আগে দেখেননি। তবে রাডারে শনাক্ত কাঠামোটি আসলে নৌযান, অন্য কোনো বস্তু নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু—সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।

দুরুপিনার ফরমেশনকে নূহের নৌকার সঙ্গে যুক্ত করার ইতিহাসও দীর্ঘদিনের। ১৯৫৯ সালে কুর্দি এক রাখালের নজরে আসার পর তুরস্কের সেনা কর্মকর্তা ইলহান দুরুপিনারের নাম অনুসারে স্থানটির নাম হয় দুরুপিনার। নৌকার মতো অস্বাভাবিক আকৃতি এবং আরারাত পর্বতের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে পরে এটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে আলোচনায় আসে।

বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর নূহের কিশতি আরারাত পর্বতমালার এলাকায় থেমেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই বর্ণনার সঙ্গে মিল খুঁজে কয়েক দশক ধরে দুরুপিনার এলাকায় নূহের নৌকার সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের সন্ধান চালানো হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিকভাবে এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা দুরুপিনারকে নূহের কিশতির ধ্বংসাবশেষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

১৯৯০-এর দশকে প্রকাশিত এক গবেষণায় আমেরিকান উদ্ধার বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফাসোল্ড ও ভূতত্ত্ববিদ লরেন্স কলিন্স দুরুপিনারের আকৃতিকে প্রাকৃতিক শিলাগঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কথিত লোহার অংশ নিয়েও তাদের গবেষণায় প্রাকৃতিক আগ্নেয় খনিজের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল।

২০২৬ সালে তুরস্ক সরকার দুরুপিনার এলাকায় আরও বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের অনুমতি দেয়। এরপর নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস নতুন করে সেখানে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করে।

রাডার জরিপের পাশাপাশি গবেষকেরা গঠনটির ভেতরে ড্রিলিংও শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে মাটির বিভিন্ন স্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সেখানে কাঠ বা অন্য কোনো জৈব পদার্থের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস জানিয়েছে, সরু ছিদ্র দিয়ে একটি ছোট ‘গোফার’ রোবটও ভেতরে পাঠানো হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, রোবটটি নিচে গিয়ে এমন কোনো শক্ত শিলা বা বেডরকে আটকে যায়নি, যা কাঠামোটিকে সাধারণ ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া ফরমেশনের উন্মুক্ত অংশ ও কিনারা থেকেও মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনায় জীবাশ্মকৃত কাঠ কিংবা মানুষের তৈরি কোনো উপাদানের চিহ্ন রয়েছে কি না, তা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

দুরুপিনারকে ঘিরে নূহের নৌকার রহস্য অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে নানা দাবি, অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার কারণে স্থানটি আলোচনায় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অনুসন্ধানই নূহের কিশতির ধ্বংসাবশেষ হিসেবে এটিকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

ফলে নতুন রাডার জরিপের দাবি কৌতূহল তৈরি করলেও এটিকে নূহের নৌকার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো নেই। রাডারে শনাক্ত অস্বাভাবিক কাঠামোর প্রকৃতি নির্ধারণে মাটির নমুনা পরীক্ষার ফল, আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান এবং স্বাধীন গবেষকদের যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

রাডার জরিপে মানবসৃষ্ট কাঠামো, বাড়ছে নূহের নৌকা নিয়ে কৌতূহল

আপডেট সময় ১২:১৪:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশনে নতুন ভূগর্ভস্থ রাডার জরিপে কিছু অস্বাভাবিক কাঠামোর সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে ‘নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস’। গবেষণা সংগঠনটির দাবি, রাডারে পাওয়া সরলরেখা, কোণাকুণি সংযোগ, স্তরবিন্যাস ও সম্ভাব্য ফাঁকা জায়গাগুলো প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠনের বদলে কোনো মানবসৃষ্ট কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তবে এ দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি এবং গবেষণাটি পিয়ার-রিভিউডও নয়।

জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই জরিপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দুরুপিনার রহস্য আবারও আলোচনায় এসেছে। পাহাড়ের ঢালে নৌকার মতো দেখতে অস্বাভাবিক এই আকৃতি বহু বছর ধরেই গবেষক ও অনুসন্ধানকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

নতুন জরিপে প্রকৌশলী ড. খসরো বাখতারের তৈরি ‘বাখতাররাডার’ নামের একটি ভূগর্ভস্থ ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানসের দাবি, রাডার স্ক্যানে কয়েকটি সরলরেখা, কোণাকুণি সংযোগ, স্তরবিন্যাস এবং সম্ভাব্য ফাঁকা অংশ শনাক্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন  ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকায় বসা নিয়ে দ্বন্দ্ব: সহযাত্রীর ঘুষিতে১ জনের মৃত্যু

গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব বৈশিষ্ট্য সম্ভাব্য করিডর, কক্ষ কিংবা কাঠামোর ভেতরের একাধিক স্তরের অংশ হতে পারে। তাদের দাবি, বৈশিষ্ট্যগুলোকে শুধু স্বাভাবিক শিলার অস্বাভাবিকতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে একই কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ড. বাখতার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, কয়েক দশকের কর্মজীবনে তিনি এমন অস্বাভাবিকতা আগে দেখেননি। তবে রাডারে শনাক্ত কাঠামোটি আসলে নৌযান, অন্য কোনো বস্তু নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু—সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।

দুরুপিনার ফরমেশনকে নূহের নৌকার সঙ্গে যুক্ত করার ইতিহাসও দীর্ঘদিনের। ১৯৫৯ সালে কুর্দি এক রাখালের নজরে আসার পর তুরস্কের সেনা কর্মকর্তা ইলহান দুরুপিনারের নাম অনুসারে স্থানটির নাম হয় দুরুপিনার। নৌকার মতো অস্বাভাবিক আকৃতি এবং আরারাত পর্বতের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে পরে এটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে আলোচনায় আসে।

বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর নূহের কিশতি আরারাত পর্বতমালার এলাকায় থেমেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই বর্ণনার সঙ্গে মিল খুঁজে কয়েক দশক ধরে দুরুপিনার এলাকায় নূহের নৌকার সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের সন্ধান চালানো হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিকভাবে এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা দুরুপিনারকে নূহের কিশতির ধ্বংসাবশেষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

১৯৯০-এর দশকে প্রকাশিত এক গবেষণায় আমেরিকান উদ্ধার বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফাসোল্ড ও ভূতত্ত্ববিদ লরেন্স কলিন্স দুরুপিনারের আকৃতিকে প্রাকৃতিক শিলাগঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কথিত লোহার অংশ নিয়েও তাদের গবেষণায় প্রাকৃতিক আগ্নেয় খনিজের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল।

২০২৬ সালে তুরস্ক সরকার দুরুপিনার এলাকায় আরও বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের অনুমতি দেয়। এরপর নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস নতুন করে সেখানে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করে।

রাডার জরিপের পাশাপাশি গবেষকেরা গঠনটির ভেতরে ড্রিলিংও শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে মাটির বিভিন্ন স্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সেখানে কাঠ বা অন্য কোনো জৈব পদার্থের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস জানিয়েছে, সরু ছিদ্র দিয়ে একটি ছোট ‘গোফার’ রোবটও ভেতরে পাঠানো হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, রোবটটি নিচে গিয়ে এমন কোনো শক্ত শিলা বা বেডরকে আটকে যায়নি, যা কাঠামোটিকে সাধারণ ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া ফরমেশনের উন্মুক্ত অংশ ও কিনারা থেকেও মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনায় জীবাশ্মকৃত কাঠ কিংবা মানুষের তৈরি কোনো উপাদানের চিহ্ন রয়েছে কি না, তা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

দুরুপিনারকে ঘিরে নূহের নৌকার রহস্য অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে নানা দাবি, অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার কারণে স্থানটি আলোচনায় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অনুসন্ধানই নূহের কিশতির ধ্বংসাবশেষ হিসেবে এটিকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

ফলে নতুন রাডার জরিপের দাবি কৌতূহল তৈরি করলেও এটিকে নূহের নৌকার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো নেই। রাডারে শনাক্ত অস্বাভাবিক কাঠামোর প্রকৃতি নির্ধারণে মাটির নমুনা পরীক্ষার ফল, আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান এবং স্বাধীন গবেষকদের যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।