ঢাকা ১২:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম :
রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি ও সমাধান মিয়ানমারেই: তারেক রহমান এক কোটি দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠাতে কাজ করছে সরকার: নুরুল হক নুর ৩৮ দিনের সাইকেলযাত্রায় এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে কাপ্তাইয়ের বীর কুমার তনচংগ্যা অনলাইনে হুংকার দিয়ে ভয় দেখানো যাবে না: তথ্য প্রতিমন্ত্রী বনশ্রী-আফতাব নগরে ২ নম্বর স্টিল ফুটব্রিজ চালু মরিয়মের আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় মামা ওবায়দুর কারাগারে মেটাকে ঢাকায় অফিস খোলার আহ্বান শামা ওবায়েদের রাবি স্টেশনে সব ট্রেনের যাত্রাবিরতি চান শিক্ষার্থীরা বিদায়ী ম্যাচে সোনালি ‘১০’, মেসির বিশেষ জার্সিতে চমক পণ্য খালাসে সময়-খরচ কমাতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর

রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি ও সমাধান মিয়ানমারেই: তারেক রহমান

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 5

ছবি: সংগৃহীত

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। একই সঙ্গে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত হয়।

তারেক রহমান বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন। ১৯৭৮ সালে এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮০-এর দশকজুড়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন প্রত্যক্ষ করেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর সংকট আরও গভীর হয়।

আরও পড়ুন  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ওয়াকফ প্রশাসকের সৌজন্য সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে এখনও মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে, ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন একটি প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়নেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে তাদের পুনঃএকীভূত হওয়ার প্রস্তুতি থাকে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য শিবিরগুলো আদর্শ স্থান নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির ব্যয় প্রতিদিন বাড়ছে। এর প্রভাব শুধু রোহিঙ্গাদের ওপর নয়, কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাংলাদেশের ওপর এখন বিপুল।

দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। অথচ প্রয়োজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হলেও ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামানো হয়েছে, যা শুধু ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের বহন করার প্রত্যাশাও করা যায় না।

রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনও নিশ্চিত হয়নি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, এখন শুধু সহমর্মিতা প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংকটের মূল কারণ ও সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে যেতে হবে।

এ জন্য প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। এর প্রথমটিতে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা করার কথাও বলেন তিনি।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন দীর্ঘদিনের মানবিক দায়িত্ব পালনের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।

চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাকে অব্যাহত সহায়তার আহ্বান জানান। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।

পঞ্চমত, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তাদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাওয়াই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত না থাকে; বরং ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার ভিত্তিতে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে।

নিউজটি শেয়ার করুন

রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি ও সমাধান মিয়ানমারেই: তারেক রহমান

আপডেট সময় ১২:০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। একই সঙ্গে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত হয়।

তারেক রহমান বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন। ১৯৭৮ সালে এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮০-এর দশকজুড়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন প্রত্যক্ষ করেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর সংকট আরও গভীর হয়।

আরও পড়ুন  জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে ঢাকার পথে প্রধান উপদেষ্টা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে এখনও মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে, ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন একটি প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়নেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে তাদের পুনঃএকীভূত হওয়ার প্রস্তুতি থাকে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য শিবিরগুলো আদর্শ স্থান নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির ব্যয় প্রতিদিন বাড়ছে। এর প্রভাব শুধু রোহিঙ্গাদের ওপর নয়, কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাংলাদেশের ওপর এখন বিপুল।

দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। অথচ প্রয়োজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হলেও ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামানো হয়েছে, যা শুধু ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের বহন করার প্রত্যাশাও করা যায় না।

রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনও নিশ্চিত হয়নি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, এখন শুধু সহমর্মিতা প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংকটের মূল কারণ ও সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে যেতে হবে।

এ জন্য প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। এর প্রথমটিতে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা করার কথাও বলেন তিনি।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন দীর্ঘদিনের মানবিক দায়িত্ব পালনের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।

চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাকে অব্যাহত সহায়তার আহ্বান জানান। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।

পঞ্চমত, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তাদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাওয়াই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত না থাকে; বরং ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার ভিত্তিতে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে।