জুম চাষ: পাহাড়ের মাটি ও মানুষের জীবনের শত বছরের ঐতিহ্য
- আপডেট সময় ০৫:৫৭:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 15
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জুম চাষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। শত শত বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাহাড়ের মানুষ এই কৃষিপদ্ধতির মাধ্যমে নিজেদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে আসছেন। তাই এটি তাদের কেবল খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়, বরং পাহাড়িদের আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য এবং স্বনির্ভরতার প্রতীক। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ ১৩টির বেশি পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গেও জুম চাষ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক রীতি, উৎসব, গান ও ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গের সঙ্গে এই কৃষিপদ্ধতির রয়েছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।
সমতল ভূমির মতো পাহাড়ে বিস্তৃত কৃষিজমি না থাকায় ঢালু পাহাড়ের জমিকে কাজে লাগিয়েই গড়ে উঠেছে জুম চাষের এই স্বতন্ত্র পদ্ধতি। প্রকৃতির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল এ চাষে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। নির্দিষ্ট একটি পাহাড় নির্বাচন করে সেখানকার গাছপালা ও জঙ্গল কেটে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে সেই শুকনো জঙ্গল পুড়িয়ে জমি প্রস্তুত করা হয়। আগুনে পুড়ে যাওয়া ছাই মাটির উর্বরতা শক্তি প্রাকৃতিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। পরে বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে সেখানে বীজ বপন করা হয়।
একসময় বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ জীবিকার জন্য জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কোনো কোনো সময় প্রায় ৯৫ শতাংশ পাহাড়ি পরিবার এই চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জানা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়ায় জুম চাষের পরিধি অনেক কমে এসেছে। আগে যেখানে বিশাল পাহাড়জুড়ে জুম ক্ষেত দেখা যেত, এখন সেখানে অনেক জায়গায় ছোট পরিসরে আড়ি কিংবা আধা আড়ি জমিতে এই চাষ করা হয়। দুর্গম ও প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনও জুম চাষের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন অনেক পাহাড়ি পরিবার। কোথাও এটি জীবিকার অংশ, আবার কোথাও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে টিকে আছে।
জুম চাষের প্রস্তুতি শুরু হয় বছরের শেষ দিকে। সাধারণত পৌষ-মাঘ মাসে জুমের জন্য উপযুক্ত পাহাড় নির্বাচন করা হয়। এরপর ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে নির্বাচিত পাহাড়ের জঙ্গল কেটে ফেলা হয়। কাটা গাছপালা ও লতাপাতা কিছুদিন পাহাড়ের ঢালে শুকিয়ে নেওয়া হয়। চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক আগে শুকনো জঙ্গল পুড়িয়ে জমি চাষের উপযোগী করা হয়। আগুনে পুড়ে তৈরি হওয়া ছাই মাটিতে মিশে প্রাকৃতিকভাবে উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। এরপর বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির দেখা মিললেই শুরু হয় বীজ বপনের কাজ।
জুমের জমিতে প্রচলিত কৃষির মতো একটিমাত্র ফসল চাষ করা হয় না। পাহাড়ের ঢালে কোদাল বা দা দিয়ে ছোট ছোট গর্ত তৈরি করে একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বীজ বপন করা হয়। ধানের পাশাপাশি সেখানে চাষ করা হয় মারফা বা পাহাড়ি শসা, তিল, কাকন, যব, বেগুন, মরিচ, ঠান্ডা আলু, ঢেঁড়স, তুলা, আদা, হলুদসহ নানা ধরনের ফসল। বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ফসলও জুমে উৎপাদিত হয়। একটি জুমের জমিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের সাথী ফসল উৎপাদনের সুযোগ থাকায় পাহাড়ি মানুষদের কাছে জুমকে অনেক সময় ‘এক বাজার’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। একটি জমি থেকেই পরিবারের খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের নানা ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। ফলে বাজার থেকে প্রধানত লবণ ও চিদোল-নাপ্পির মতো প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনলেই অনেকটা চলে যায়।
জুম চাষের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জুমের জমি নির্বাচন থেকে শুরু করে জঙ্গল কাটা, বীজ বপন, পরিচর্যা, ফসল কাটা এবং নতুন ফসল ঘরে তোলা—প্রতিটি পর্যায়েই রয়েছে দলবদ্ধ শ্রম ও পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি। পাহাড়ের মানুষ একসঙ্গে জুমের কাজে অংশ নেন। দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন পরিশ্রমের পাশাপাশি গান ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন তাদের কাজের সঙ্গে আনন্দের আবহ তৈরি করে।
জুমের ফসল ঘরে তোলার সময় শরৎ ও হেমন্তে পাহাড়ি বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। নতুন জুমের চালের ভাত, জুমে উৎপাদিত নানা সবজি দিয়ে রান্না করা ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’সহ বিভিন্ন খাবারের আয়োজন থাকে এসব উৎসবে। নতুন ফসলকে ঘিরে পাড়া-মহল্লায় তৈরি হয় আনন্দের পরিবেশ। জুম কাটার কঠিন পরিশ্রমের ক্লান্তি ভুলে তরুণ-তরুণীদের কণ্ঠে ভেসে আসে জুমের গান। কৃষিকাজ তখন আর শুধু শ্রমের বিষয় থাকে না, তা পরিণত হয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনের এক উপলক্ষে।
জুম চাষের সঙ্গে পাহাড়ি মানুষের পোশাক ও সংস্কৃতিরও রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। পাহাড়ি আদিবাসী নারীরা কোমর তাঁতে বোনা ঐতিহ্যবাহী পিনন-খাদি পরে জুমের ক্ষেতে ফসল তুলতে যান। পাহাড়ের সবুজ ঢালে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নারীদের এমন উপস্থিতি যেন প্রকৃতি ও সংস্কৃতির একসঙ্গে মিশে যাওয়ার দৃশ্য তৈরি করে। জুমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সমাজব্যবস্থা, ভাষা, গান ও লোককথারও বিকাশ ঘটেছে।
তবে আধুনিকতার পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় জুম চাষ এখন আগের অবস্থানে নেই। সমতল ভূমির কৃষির মতো যান্ত্রিক সুবিধা না থাকা, বিকল্প জীবিকার সুযোগ বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি জনপদে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে এই চাষ দিন দিন প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। তারপরও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনও জুমের অস্তিত্ব রয়েছে। অনেকের কাছে এটি খাদ্যের উৎস, আবার অনেকের কাছে এটি পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য ও নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার একটি মাধ্যম।
জুম চাষকে তাই শুধু পাহাড়ের ঢালে বীজ বোনা ও ফসল উৎপাদনের একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ি মানুষের জীবন, শ্রম, প্রকৃতিনির্ভরতা, সামাজিক সম্পর্ক, উৎসব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। পাহাড়ের মাটিতে বোনা প্রতিটি বীজের সঙ্গে মিশে থাকে প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের গল্প। পরিবর্তনের স্রোতে জুম চাষের বিস্তৃতি কমে এলেও পাহাড়ি মানুষের ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে এর বন্ধন এখনও অটুট। তাই জুম চাষ আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে।



















