মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে কি কমছে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব?
- আপডেট সময় ০৩:৪৯:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
- / 13
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুক্রবার, ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’কে ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য সম্ভাব্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পারস্পরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ববোধ, ইসলামি সংহতি, অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ এবং দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তিতে এই চুক্তি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন দেশ নিজেদের যৌথ নিরাপত্তা জোরদার এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করবে।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো ও সামরিক সম্পদ রয়েছে। তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার কারণে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে বিবেচনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো তিন প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তায় আরও বেশি কৌশলগত স্বনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে। তবে এর অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং ওয়াশিংটনের পাশাপাশি বিকল্প নিরাপত্তা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব তৈরির চেষ্টা।
রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেনের মতে, এক দশকের বেশি সময় ধরে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, যুদ্ধ পরিচালনার ধরন এবং পরবর্তী সময়ে সমঝোতার বিভিন্ন উদ্যোগ এসব দেশের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নতুন জোটে তিন দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক এবং বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতার অধিকারী। অন্যদিকে পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত সক্ষমতা একত্র হলে তিন দেশ একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
তবে চুক্তিটি ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়। বরং সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্প, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত সমন্বয়ের কাঠামো হিসেবে এটি কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের জন্য চুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ। কয়েক দশক ধরে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনে আসছে। দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে চায় দেশটি।
এ ক্ষেত্রে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা সৌদি আরবকে সহায়তা করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর রিয়াদের একচেটিয়া নির্ভরতা কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসির মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পরিবর্তনের এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইঙ্গিত। তাঁর মতে, বিষয়টি শুধু সামরিক জোটের প্রশ্ন নয়; বরং আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে হিসাব করছে।
তিন দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগের বড় একটি অংশ ইরানকে ঘিরে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে তিন দেশেরই আলাদা মাত্রায় উদ্বেগ রয়েছে।
তবে চুক্তির মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তিন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা সমন্বয় বাড়ালে আঞ্চলিক বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সম্মিলিত সক্ষমতা বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চুক্তিটি ইসরাইলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব—তিন দেশই বিভিন্ন সময়ে গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছেন। পাকিস্তানও গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং তথাকথিত ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণার বিরোধিতা করেছে।
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হলেও গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও রিয়াদ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট পথের দাবি জানিয়ে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রতিরক্ষা সমন্বয়কে ইসরাইলের আঞ্চলিক প্রভাবের বিপরীতে পরোক্ষ ভারসাম্য তৈরির উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে চুক্তিটি সরাসরি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয় বলে তুরস্কের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও আরব মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ালে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে সৌদি আরব যদি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে রিয়াদের কৌশলগত বিকল্প বাড়বে। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে দেশটি।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা করতে পারে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পাশাপাশি মিসরের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের প্রবণতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ব্রেট ম্যাকগার্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চুক্তিটির বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, তিন রাষ্ট্রের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তাদের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার শর্ত রাখা হয়েছে, যা ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্য পরিবর্তনশীল ও নতুন বাস্তবতার যুগে প্রবেশ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রতিফলন। এর মাধ্যমে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের আঞ্চলিক সংকটে আরও বেশি কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
তবে এই উদ্যোগ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বা ইসরাইলবিরোধী সামরিক জোটে পরিণত হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি তিন দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নিজেদের প্রভাব শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে।
তবু চুক্তিটি ওয়াশিংটনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ পরিবর্তনের পথে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও মিত্রতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন কৌশলগত সমন্বয় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের ভূমিকা ও প্রভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি
























