ঢাকা ১২:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত প্রায় ৩ হাজার, বাড়ছে মানবিক সংকট

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:৪৭:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
  • / 24

ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পর নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। বুধবার (১ জুলাই) দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৯৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ১১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং প্রায় ১৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

ভূমিকম্পের পরও দেশজুড়ে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও হাজারো মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকর্মীদের ভাষ্য, সময় যত গড়াচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা ততই কমে আসছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের জন্য গভীর ক্ষতির কারণ হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরের লা গুয়ারিয়া শহর। ধসে পড়া অধিকাংশ ভবনে ‘ডি’ (Deceased) চিহ্ন দেওয়া হয়েছে, যা নির্দেশ করে সেখানে অনুসন্ধানে জীবিত কাউকে পাওয়া যায়নি। স্পেনের একটি উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়কারী হাভিয়ের রোডস বলেন, যেখানে জীবিত থাকার সম্ভাবনা নেই, সেখানে উদ্ধারকাজ দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে না।

আরও পড়ুন  কঙ্গোতে সংঘাতের তীব্রতা: জানুয়ারি থেকে নিহত ৭ হাজার, লাখো মানুষ আশ্রয়হীন

তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কিছু আশার খবর মিলেছে। মঙ্গলবার তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের ছয় দিন পর শিশুটির জীবিত উদ্ধার হওয়া উদ্ধারকর্মীদের কাছে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সাধারণত খুবই কম।

লা গুয়ারিয়া অঙ্গরাজ্যের কারাবালেদা শহরের বাসিন্দা হোসে রাফায়েল, যিনি এখনও নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজছেন, বলেন, আর কাউকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় পাওয়া যাবে বলে তার আশা নেই।

অন্যদিকে একটি ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান শেষে এক মার্কিন উদ্ধারকর্মী স্থানীয়দের জানান, সেখানে জীবনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এতে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে হতাশা আরও বেড়ে যায়।

জাতিসংঘের হিসাবে, এখনও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে তেলসমৃদ্ধ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আগেই দুর্বল ছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্য সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। লা গুয়ারিয়ার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সীমিত ত্রাণের কারণে অনেক সময় খাবার সংগ্রহে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

এদিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ভেনেজুয়েলা মিশনের প্রধান লিয়া পোগগিও পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে মন্তব্য করেছেন।

ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার পৌঁছে দেওয়া স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, অনেক মানুষ এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) তিন মাস ধরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে ৫ কোটি মার্কিন ডলারের তহবিল চেয়েছে।

এদিকে নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মুখপাত্র ক্রিস্টিনা লিন্ডমেয়ার জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বর্তমানে চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। ভূমিকম্পের আগেই দেশটিতে টিকাদানের হার কম ছিল। ফলে হাম, ডিপথেরিয়াসহ টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। অন্যদিকে নাসার প্রাথমিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত প্রায় ৩ হাজার, বাড়ছে মানবিক সংকট

আপডেট সময় ১০:৪৭:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পর নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। বুধবার (১ জুলাই) দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৯৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ১১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং প্রায় ১৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

ভূমিকম্পের পরও দেশজুড়ে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও হাজারো মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকর্মীদের ভাষ্য, সময় যত গড়াচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা ততই কমে আসছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের জন্য গভীর ক্ষতির কারণ হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরের লা গুয়ারিয়া শহর। ধসে পড়া অধিকাংশ ভবনে ‘ডি’ (Deceased) চিহ্ন দেওয়া হয়েছে, যা নির্দেশ করে সেখানে অনুসন্ধানে জীবিত কাউকে পাওয়া যায়নি। স্পেনের একটি উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়কারী হাভিয়ের রোডস বলেন, যেখানে জীবিত থাকার সম্ভাবনা নেই, সেখানে উদ্ধারকাজ দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে না।

আরও পড়ুন  জাতিসংঘে মানবিক সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ

তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কিছু আশার খবর মিলেছে। মঙ্গলবার তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের ছয় দিন পর শিশুটির জীবিত উদ্ধার হওয়া উদ্ধারকর্মীদের কাছে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সাধারণত খুবই কম।

লা গুয়ারিয়া অঙ্গরাজ্যের কারাবালেদা শহরের বাসিন্দা হোসে রাফায়েল, যিনি এখনও নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজছেন, বলেন, আর কাউকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় পাওয়া যাবে বলে তার আশা নেই।

অন্যদিকে একটি ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান শেষে এক মার্কিন উদ্ধারকর্মী স্থানীয়দের জানান, সেখানে জীবনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এতে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে হতাশা আরও বেড়ে যায়।

জাতিসংঘের হিসাবে, এখনও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে তেলসমৃদ্ধ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আগেই দুর্বল ছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্য সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। লা গুয়ারিয়ার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সীমিত ত্রাণের কারণে অনেক সময় খাবার সংগ্রহে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

এদিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ভেনেজুয়েলা মিশনের প্রধান লিয়া পোগগিও পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে মন্তব্য করেছেন।

ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার পৌঁছে দেওয়া স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, অনেক মানুষ এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) তিন মাস ধরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে ৫ কোটি মার্কিন ডলারের তহবিল চেয়েছে।

এদিকে নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মুখপাত্র ক্রিস্টিনা লিন্ডমেয়ার জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বর্তমানে চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। ভূমিকম্পের আগেই দেশটিতে টিকাদানের হার কম ছিল। ফলে হাম, ডিপথেরিয়াসহ টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। অন্যদিকে নাসার প্রাথমিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।