অভিন্ন সমৃদ্ধিতে বিগ-বি জোরদার করছে বাংলাদেশ-জাপান
- আপডেট সময় ১২:৪৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 20
বাংলাদেশ ও জাপান শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে সম্মত হয়েছে। ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ নামে নতুন কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি জাপান সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এ সফর উপলক্ষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের সহযোগিতার বিভিন্ন অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, উদীয়মান অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় বিগ-বি উদ্যোগের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই নেতা।
নতুন কাঠামোয় চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নীতিনির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও কার্যকর করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ সহযোগিতায় শিল্পের বহুমুখীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মাতারবাড়ীকে শিল্প ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে বিগ-বির সম্প্রসারিত কাঠামোয়। এ লক্ষ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে সমন্বিত পণ্য পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবেশদ্বার হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
যৌথ বিবৃতিতে শিল্পের মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী করতে গভীর সমুদ্রবন্দরের সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং আধুনিক পরিবহন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পণ্য পরিবহনে দক্ষতা বাড়বে, সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ উন্নত হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভবিষ্যতে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দুই নেতা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব স্বীকার করে তাঁরা বলেছেন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।
বিগ-বির আওতায় দেশের আকাশপথ ও নগর পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও পর্যটন সম্প্রসারণে আধুনিক বিমানবন্দর অবকাঠামোর গুরুত্বের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে। পাশাপাশি ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে গণপরিবহনের জন্য নির্মিত দ্রুতগতির রেলব্যবস্থা—ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিটের (এমআরটি) লাইনগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং পরিবহন অবকাঠামোতে আরও সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন দুই নেতা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে দেশের সংযোগ বাড়াতে এসব প্রকল্প ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ কাঠামো চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা পেয়েছে। এর আওতায় অবকাঠামো বিনিয়োগের সঙ্গে শিল্পের বিকাশ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সমন্বয় ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
পৃথক উন্নয়ন প্রকল্পের গণ্ডি পেরিয়ে সরকার, বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও শিল্প খাতের অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই এ কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল, বিমান যোগাযোগ, নগর পরিবহন ও ডিজিটাল রূপান্তরের উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দুই প্রধানমন্ত্রী তাঁদের জনগণের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে নেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও দেশটির জনগণকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপানের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পায়। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছাতে পারে—এ সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান সানায়ে তাকাইচি। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। সফরকে কেন্দ্র করে ঘোষিত বড় বিনিয়োগ উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানান দুই নেতা। একই সঙ্গে স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হন তাঁরা।
সহযোগিতামূলক ও স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎপাদনশিল্প, খাদ্য ও কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেন সানায়ে তাকাইচি। অন্যদিকে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও ব্যবসাবান্ধব বিধিবিধান নিশ্চিত করতে তাঁর সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন তারেক রহমান।
করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়, অর্থ প্রেরণ ও লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান দুই নেতা।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্বাক্ষরিত সহযোগিতা চুক্তিগুলোকেও তাঁরা স্বাগত জানান। এই সহযোগিতার গতি ধরে রাখতে জাপানের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরে পাঠানো এবং আরও অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্ল্যাটফর্ম এবং বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার বিষয়েও একমত হয়েছেন তাঁরা।




















