হামলা, হুমকি ও ধর্মান্তরের চাপ: পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
- আপডেট সময় ০২:২৬:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / 15
বিবিসির প্রতিবেদন
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর একের পর এক হামলা, যৌন হয়রানি এবং ধর্মান্তরের চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় পৃথক ঘটনায় কয়েকটি খ্রিস্টান পরিবার হামলা ও হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছে। এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পাঁশকুড়ার এক খ্রিস্টান পরিবারের অভিযোগ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্য পরিচয় দেওয়া একদল ব্যক্তি তাদের বাড়িতে ঢুকে হামলা চালিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, রেশন ও আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া এবং স্থানীয়ভাবে কাজ না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
হামলার শিকার পার্বতী হেমব্রম সোরেন জানান, সোমবার রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রার্থনা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা। এ সময় ৩০ জনের বেশি ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় জোর করে বাড়িতে ঢুকে তাদের মারধর করেন।
সোরেনের ভাষ্য, হামলাকারীরা তার চুলের মুঠি ধরে মারধর করেন, স্বামীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং তার ননদের গায়েও হাত তোলেন। তারা পরিবারের সদস্যদের ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। নিজের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও হামলাকারীরা মুছে দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। পরে পুলিশ তার ফোনটি ফেরত দেয়।
সোরেনের অভিযোগ, গত ১১ অক্টোবরও একই ব্যক্তিরা তাদের বাড়িতে এসে খ্রিস্টধর্ম পালন না করার জন্য হুমকি দিয়েছিলেন। এবার তারা পরিবারটিকে খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে হিন্দুধর্ম গ্রহণের জন্য চাপ দেন। খ্রিস্টধর্মকে ‘আমেরিকান ধর্ম’ বলেও উল্লেখ করেন তারা।
‘বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা’ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিক জানান, ঘটনার বিষয়ে খোঁজ নিতে সংস্থার এক আইনজীবী অভিযোগকারীকে ফোন করেছিলেন। সে সময় হামলাকারীরা ফোনটি কেড়ে নিয়ে নিজেদের বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্য পরিচয় দিয়ে আইনজীবীকে হুমকি দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইনজীবীর সঙ্গে কথা হচ্ছে বুঝতে পেরে তারা ফোনের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সোরেনের দাবি, হামলাকারীরা তাদের বাড়ির উঠানে তুলসিমঞ্চ ও মনসা মন্দির তৈরি করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। তারা তা করতে অস্বীকৃতি জানালে পরিবারের সদস্যদের কাজ না দিতে স্থানীয়দের নিষেধ করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং রেশন ও আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
ঘটনার সময় বাড়িতে সোরেন, তার স্বামী, দুই সন্তান এবং তিন আত্মীয় ছিলেন। তার অভিযোগ, পরিবারের প্রার্থনার স্থানটি পুড়িয়ে ও ছিঁড়ে ফেলা হয়। তাকে এবং তার ননদকে মারধর করা হয়। হামলাকারীরা আবার ফিরে এসে ৫০ থেকে ১০০ জনকে সঙ্গে নিয়ে হামলার হুমকিও দিয়েছেন।
নিরাপত্তার আশঙ্কায় সোরেন ও তার পরিবার বর্তমানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তার স্বামী টোটো চালান। টোটো কেনার জন্য দুই লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল জানিয়ে সোরেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের নিরাপত্তা ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
এর কয়েক দিন আগে, ১৮ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় একাধিক খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে বজরং দলের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, এক নারীকে যৌন হয়রানি করা হয়, তার পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং ধর্মান্তরের উদ্দেশ্যে কয়েকজনকে জোর করে একটি পূজামণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়।
ওই ঘটনার অভিযোগকারী নারী বিবিসি বাংলাকে জানান, হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে তিনি গুরুতর অসুস্থ এবং চিকিৎসাধীন। পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ১৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত পরিচয় দেওয়া একদল ব্যক্তি তার বাড়িতে এসে পরিবারের সদস্যদের যিশুখ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাস ত্যাগের জন্য চাপ দেন। এ সময় তাদের ভয় দেখানো ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগে ওই নারী বলেন, হামলাকারীরা তার মাথায় ও কানের নিচে আঘাত করলে তিনি জ্ঞান হারান। এরপর তার পোশাক ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং শাড়ি খুলে দেওয়া হয়। পরে তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে সবার সামনে তাকে জোর করে গোসল করানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ওই নারীর আরও অভিযোগ, ২০ অক্টোবর তাকে, তার স্বামীসহ মোট চারজন খ্রিস্টানকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গ্রামের একটি পূজামণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করা হয়। পুলিশের কাছে অভিযোগ করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ওই নারী।
দুই ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠলেও পাঁশকুড়ার ঘটনায় এখনো এফআইআর দায়ের হয়নি। পাঁশকুড়া থানার এক কর্মকর্তা জানান, তারা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। অভিযোগ জমা পড়লেই এফআইআর করা হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, চন্দ্রকোনার ঘটনায় ২০ অক্টোবর এফআইআর করা হয়েছে। খুনের চেষ্টা, নারীকে বিবস্ত্র করার উদ্দেশ্যে হামলা, বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ, ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত, অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন এবং নারীর শ্লীলতাহানিসহ একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, অভিযোগকারীর বয়ান, মেডিকেল রিপোর্ট কিংবা জমা দেওয়া অন্য নথিতে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তারের মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এফআইআরে ১৩ জনের নাম রয়েছে, যাদের সবাই স্থানীয় বাসিন্দা বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
এদিকে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যের অন্যতম নেতা চন্দ্রনাথ দাস খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, বজরং দল বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্যরা কাউকে আক্রমণ করেন না কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেন না। তবে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনার অভিযান চালানোর কথা স্বীকার করেন তিনি।
চন্দ্রনাথ দাস বলেন, তাদের লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গসহ পুরো ভারতে খ্রিস্টানদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনা। ১৯৬৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ধর্মান্তর রোধ এবং অন্য ধর্মে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনা সংগঠনটির লক্ষ্য বলে দাবি করেন তিনি। প্রতি বছর পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে প্রকাশ্যে ও পুলিশের জানিয়ে হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনা হয় বলেও তার বক্তব্য।
বজরং দল বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত একটি যুব সংগঠন।
‘বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা’র প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিক বলেন, একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে তাদের আশঙ্কা। তার অভিযোগ, সরকার তাদের আবেদনে সাড়া দিচ্ছে না এবং ঘটনাগুলোর যথাযথ তদন্তও হচ্ছে না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, নতুন সরকার যেকোনো অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে মনে করছেন, তাদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার বক্তব্য, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না এবং কে কোন ধর্ম পালন করবেন, তা সরকার নির্ধারণ করে না।
পশ্চিম মেদিনীপুরে খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগে বিজেপিকে নিশানা করেছেন কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল। চন্দ্রকোনায় এক নারীকে বিবস্ত্র করে ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠানে বাধ্য করার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





















