ঢাকা ১১:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌদি-ইরান সংঘাত: কঠিন চাপে পাকিস্তান

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 26

ছবি সংগৃহীত

 

সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় কূটনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে পাকিস্তান। রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ধরে রাখার যে চেষ্টা ইসলামাবাদ করে আসছে, চলমান সংঘাত তা আরও জটিল করে তুলেছে।

বছরের বেশিরভাগ সময় পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের মাত্রা বাড়ায় এই ভারসাম্য ধরে রাখা ইসলামাবাদের জন্য আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন  ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব ইরানের

সম্প্রতি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বও সম্প্রসারিত হয়েছে। ত্রিপক্ষীয় ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এদিকে জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান এমন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো ইরান ও হুথিদের কারণে বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে সংঘাত যাতে আরও বিস্তৃত না হয়, সে বিষয়ে ইসলামাবাদকে সতর্ক অবস্থান নিতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সৌদি আরব-ইয়েমেন সীমান্তের কাছে পাকিস্তানি সেনারা ইতোমধ্যে মোতায়েন রয়েছে। এর আগে দ্বিপক্ষীয় সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্যও পাকিস্তান পরিচিত ছিল।

সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং রিয়াদ পাকিস্তানের কাছে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা চাইলে ইসলামাবাদের ওপর তার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি রক্ষার চাপ বাড়তে পারে। তবে এমন পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে ইতিবাচক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাকিস্তানি কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ভারতের সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীও বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি বাড়লে তা দেশটির জন্য কূটনৈতিক ও রসদগত—দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তবে সামরিকভাবে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার আগে সংকট নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তান ইরানের কাছে সৌদি আরবের একটি সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এতে ইরানকে তার মিত্র হুথিদের সংযত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক নেতারা ইরানি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাকিস্তান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করলে এর প্রভাব কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশটি পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে এবং ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্তেও উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আঞ্চলিক বিরোধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের সামনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মধ্যস্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা থাকা জরুরি। ইসলামাবাদের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রশংসা করলেও ইরান সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে।

এখানেই পাকিস্তানের জন্য বড় বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্বের একটি কারণ হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা। আবার একই সম্পর্ক তেহরানের কাছে ইসলামাবাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

পাকিস্তান যদি সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার কূটনৈতিক সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ প্রতিরক্ষা বা সামরিক অভিযানে সহায়তা দেওয়ার পার্থক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদক্ষেপ পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী অবস্থান থেকে সরাসরি সংঘাতে সম্পৃক্ত পক্ষের ভূমিকায় নিয়ে যেতে পারে।

এর ফলে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থও হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন বিস্তৃত সামরিক চুক্তির ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের অনাগ্রহের পেছনে একই ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংঘাতের বিস্তার সীমিত থাকলে পাকিস্তান সম্ভবত মধ্যপন্থা ধরে রাখার চেষ্টা করবে। এর অর্থ হতে পারে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রাখা, কিন্তু হুথি ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ না নেওয়া।

তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ইরানকে সংযত হওয়ার জন্য প্রভাবিত করা সম্ভব বলে মনে করলে সেই যোগাযোগ আরও জোরালো হতে পারে।

তবে সংকট গভীর হলে পাকিস্তানের কৌশল বদলের সুযোগও কমে আসবে। সৌদি ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি কিংবা বড় ধরনের সামরিক সহায়তার আহ্বান ইসলামাবাদের ওপর হস্তক্ষেপের চাপ বাড়াতে পারে।

তখন পাকিস্তানকে সৌদি আরবের সঙ্গে জোটের কৌশলগত গুরুত্ব এবং ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

চলমান পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলের সীমাবদ্ধতাও সামনে আনছে। দেশটি একদিকে ইরান ও তার মিত্রদের ওপর প্রভাব তৈরির ক্ষেত্রে নিজের কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগাতে চায়, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়।

কিন্তু একই সম্পর্কগুলো এখন পাকিস্তানের সামনে পরস্পরবিরোধী প্রত্যাশা তৈরি করছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু সৌদি আরব বা ইরানের পক্ষ নেওয়ার নয়; বরং উভয় পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ইসলামাবাদ কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান যদি সামরিক সম্পৃক্ততা সীমিত রেখে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, তাহলে এই ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সরাসরি সামরিকভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। এতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব কমার পাশাপাশি দেশটির সেনাবাহিনী নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং পশ্চিম সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ককে পাকিস্তান চাইলে সামরিক হস্তক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং কূটনৈতিক প্রভাব তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। তবে উপসাগরীয় অংশীদারদের প্রতি ইসলামাবাদ যত বেশি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নেবে, তাদের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তৈরি হলে পাকিস্তানের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তত সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

ফলে সৌদি-ইরান সংঘাত শুধু পাকিস্তানের সামরিক সম্পৃক্ততার সক্ষমতার পরীক্ষা নয়; একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দেশটির সামগ্রিক কৌশলেরও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

সৌদি-ইরান সংঘাত: কঠিন চাপে পাকিস্তান

আপডেট সময় ১০:০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় কূটনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে পাকিস্তান। রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ধরে রাখার যে চেষ্টা ইসলামাবাদ করে আসছে, চলমান সংঘাত তা আরও জটিল করে তুলেছে।

বছরের বেশিরভাগ সময় পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের মাত্রা বাড়ায় এই ভারসাম্য ধরে রাখা ইসলামাবাদের জন্য আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন  পাকিস্তান-মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আজই যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা

সম্প্রতি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বও সম্প্রসারিত হয়েছে। ত্রিপক্ষীয় ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এদিকে জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান এমন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো ইরান ও হুথিদের কারণে বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে সংঘাত যাতে আরও বিস্তৃত না হয়, সে বিষয়ে ইসলামাবাদকে সতর্ক অবস্থান নিতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সৌদি আরব-ইয়েমেন সীমান্তের কাছে পাকিস্তানি সেনারা ইতোমধ্যে মোতায়েন রয়েছে। এর আগে দ্বিপক্ষীয় সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্যও পাকিস্তান পরিচিত ছিল।

সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং রিয়াদ পাকিস্তানের কাছে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা চাইলে ইসলামাবাদের ওপর তার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি রক্ষার চাপ বাড়তে পারে। তবে এমন পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে ইতিবাচক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাকিস্তানি কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ভারতের সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীও বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি বাড়লে তা দেশটির জন্য কূটনৈতিক ও রসদগত—দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তবে সামরিকভাবে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার আগে সংকট নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তান ইরানের কাছে সৌদি আরবের একটি সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এতে ইরানকে তার মিত্র হুথিদের সংযত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক নেতারা ইরানি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাকিস্তান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করলে এর প্রভাব কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশটি পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে এবং ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্তেও উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আঞ্চলিক বিরোধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের সামনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মধ্যস্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা থাকা জরুরি। ইসলামাবাদের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রশংসা করলেও ইরান সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে।

এখানেই পাকিস্তানের জন্য বড় বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্বের একটি কারণ হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা। আবার একই সম্পর্ক তেহরানের কাছে ইসলামাবাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

পাকিস্তান যদি সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার কূটনৈতিক সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ প্রতিরক্ষা বা সামরিক অভিযানে সহায়তা দেওয়ার পার্থক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদক্ষেপ পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী অবস্থান থেকে সরাসরি সংঘাতে সম্পৃক্ত পক্ষের ভূমিকায় নিয়ে যেতে পারে।

এর ফলে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থও হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন বিস্তৃত সামরিক চুক্তির ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের অনাগ্রহের পেছনে একই ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংঘাতের বিস্তার সীমিত থাকলে পাকিস্তান সম্ভবত মধ্যপন্থা ধরে রাখার চেষ্টা করবে। এর অর্থ হতে পারে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রাখা, কিন্তু হুথি ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ না নেওয়া।

তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ইরানকে সংযত হওয়ার জন্য প্রভাবিত করা সম্ভব বলে মনে করলে সেই যোগাযোগ আরও জোরালো হতে পারে।

তবে সংকট গভীর হলে পাকিস্তানের কৌশল বদলের সুযোগও কমে আসবে। সৌদি ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি কিংবা বড় ধরনের সামরিক সহায়তার আহ্বান ইসলামাবাদের ওপর হস্তক্ষেপের চাপ বাড়াতে পারে।

তখন পাকিস্তানকে সৌদি আরবের সঙ্গে জোটের কৌশলগত গুরুত্ব এবং ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

চলমান পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলের সীমাবদ্ধতাও সামনে আনছে। দেশটি একদিকে ইরান ও তার মিত্রদের ওপর প্রভাব তৈরির ক্ষেত্রে নিজের কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগাতে চায়, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়।

কিন্তু একই সম্পর্কগুলো এখন পাকিস্তানের সামনে পরস্পরবিরোধী প্রত্যাশা তৈরি করছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু সৌদি আরব বা ইরানের পক্ষ নেওয়ার নয়; বরং উভয় পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ইসলামাবাদ কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান যদি সামরিক সম্পৃক্ততা সীমিত রেখে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, তাহলে এই ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সরাসরি সামরিকভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। এতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব কমার পাশাপাশি দেশটির সেনাবাহিনী নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং পশ্চিম সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ককে পাকিস্তান চাইলে সামরিক হস্তক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং কূটনৈতিক প্রভাব তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। তবে উপসাগরীয় অংশীদারদের প্রতি ইসলামাবাদ যত বেশি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নেবে, তাদের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তৈরি হলে পাকিস্তানের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তত সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

ফলে সৌদি-ইরান সংঘাত শুধু পাকিস্তানের সামরিক সম্পৃক্ততার সক্ষমতার পরীক্ষা নয়; একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দেশটির সামগ্রিক কৌশলেরও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।