প্রকাশ্যে তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি
- আপডেট সময় ১১:৫৫:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / 23
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশ্যে এসেছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অবস্থায় আক্রান্ত দেশকে সামরিক সক্ষমতাসহ পারস্পরিক সহায়তার সব উপায় কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা করবে অন্য দুই দেশ। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ তুরস্কের সংসদে জমা দিয়েছে দেশটির সরকার।
গত আগস্টে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির মাধ্যমে নতুন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ন্যাটো চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো এতে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ সংগ্রহ করেছে।
চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে কোনো সদস্য দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর সশস্ত্র হামলা হলে অন্য সদস্যদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে সদস্য দেশগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের সুরক্ষায় সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। কোনো দেশের সীমান্ত বা সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়লে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব উপায় ব্যবহারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্য কোনো দেশ বা একাধিক দেশের সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে আক্রান্ত দেশকে অবিলম্বে সহায়তা দেবে অন্য সদস্যরা। সহায়তার ধরন ও পরিধি নির্ধারণ করা হবে প্রয়োজনের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে দেশগুলো নিজেদের বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতার সীমার মধ্যে থেকে সামরিক উপায়সহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেবে। জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগে সহায়তা নিশ্চিত করাও এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।
চুক্তির ১৬টি অনুচ্ছেদে পারস্পরিক সামরিক সহায়তার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিন দেশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়াবে এবং নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় উন্নত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পের কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থাও থাকবে। প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবন, বিশেষায়িত প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং যৌথ উৎপাদন বাড়াতে দেশগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা হবে।
যুদ্ধ ও শান্তিকাল—উভয় সময়েই তিন দেশ সামরিক কর্মকর্তা বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও মহড়ার আয়োজন করতে পারবে। সশস্ত্র বাহিনীর পারস্পরিক কার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নত করাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমন সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ জোরদার করার অঙ্গীকার রয়েছে চুক্তিতে।
গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য তিন দেশ পারস্পরিক সম্মত নিরাপদ মাধ্যমে তথ্য বিনিময় করবে। এ ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত উপাত্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার প্রাপ্যতা ও সামঞ্জস্যের শর্তে শান্তিকাল, যুদ্ধকাল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে একে অন্যকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে।
চুক্তির অষ্টম অনুচ্ছেদে ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন। যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পথে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করা হবে কমিটির দায়িত্ব।
কমিটি বছরে দুবার বৈঠক করবে। পালাক্রমে তিন দেশের একেকটি দেশ বৈঠকের আয়োজন করবে। প্রয়োজন মনে করলে দেশগুলোর নেতারা বছরে একবার বৈঠক করতে পারবেন। এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী উপকমিটি গঠন এবং চুক্তির আওতায় বিভিন্ন সহযোগিতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে পৃথক চুক্তি বা প্রটোকল নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে। মূল তিন দেশের সর্বসম্মতিতে অন্য দেশকে এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ও নীতিও নির্ধারণ করতে পারবে কমিটি।
চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মহাসচিব তিন দেশের মধ্য থেকে পালাক্রমে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন। প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের নাগরিক। সচিবালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত নিয়ম পরবর্তী সময়ে মূল দেশগুলোর সর্বসম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
চুক্তিতে মেয়াদ শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ রাখা হয়নি। অর্থাৎ, এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১০ বছর কোনো সদস্যদেশ এটি থেকে সরে যেতে পারবে না। ১০ বছর পার হলে কোনো দেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক মাধ্যমে অন্য সদস্যদেশগুলোকে অন্তত তিন মাস আগে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
চুক্তির আওতায় পাওয়া গোপনীয় তথ্য ও নথির সুরক্ষা প্রত্যাহার বা চুক্তির অবসানের পরও বজায় রাখতে হবে। একইভাবে, চুক্তি শেষ হওয়ার আগে সম্মত হওয়া চলমান কার্যক্রম ও প্রকল্পের ওপর কোনো দেশের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে না। চুক্তির ব্যাখ্যা বা বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তা বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সমাধান করতে হবে। সংশোধনের ক্ষেত্রেও মূল তিন দেশের মধ্যে আলোচনা ও সর্বসম্মতি প্রয়োজন হবে।
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের নিজ নিজ অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চুক্তিটি কার্যকর হবে। কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির সচিবালয়ে অনুমোদনের সর্বশেষ দলিল জমা দেওয়ার দিন থেকে এটি কার্যকর বলে গণ্য হবে।
চুক্তিটি তুর্কি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় তিনটি মূল কপিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনটি ভাষার পাঠ সমানভাবে প্রামাণ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখা দিলে ইংরেজি পাঠকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।






















