ঢাকা ০১:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ইসরাইলে বিস্ফোরণে নিহত শিক্ষার্থী

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:৩৮:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / 24

ছবি সংগৃহীত

 

বছরের পর বছর সংঘাতের পর ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলাবারুদের ভয়াবহতা আবারও সামনে এসেছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে লেবানন সীমান্তের কাছে শিক্ষাসফরে গিয়ে অবিস্ফোরিত ক্লাস্টার বোমার একটি অংশের বিস্ফোরণে ১৩ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আরও ২৪ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) লেবানন সীমান্তবর্তী একটি বনাঞ্চলে এ ঘটনা ঘটে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাফতালি মাউন্টেনস ফরেস্টের একটি প্রাকৃতিক পথ ধরে হাঁটার সময় ওআরটি মাআলত স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলটি অবিস্ফোরিত বোমার মুখোমুখি হয়। পথটি ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন  ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাঁপছে ইসরাইল, নিহত কমপক্ষে ১২, আহত শতাধিক

ঘটনাস্থলের ছবি বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, রামিম রিজ এলাকার ওই পথে হাঁটার সময় এক শিক্ষার্থী মাটিতে বা পথের পাশে পড়ে থাকা হিজবুল্লাহর একটি সাবমিউনিশন দেখতে পায়। সেটি তুলে নেওয়ার একপর্যায়ে ছোট বোমার অংশটি বিস্ফোরিত হয়। এতে নবম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী নিহত হয় এবং আরও ২৪ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হন।

ইসরাইলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ধারণা, বিভিন্ন সময়ের সংঘর্ষের পর দেশটির প্রায় সব অঞ্চলেই শত শত, এমনকি হাজার হাজার অবিস্ফোরিত অস্ত্র ছড়িয়ে থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে কয়েক ডজন বিআরবি১—যা এ-০৯ নামেও পরিচিত—সাবমিউনিশন বহনকারী গ্র্যাড রকেট নিক্ষেপ করে। এসব রকেট বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্লাস্টার বোমার অংশ ছড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো মাটিতে পড়েও বিস্ফোরিত হয় না।

হিজবুল্লাহ ছাড়াও ইরান ও ইয়েমেনভিত্তিক তাদের মিত্রগোষ্ঠী হুথিরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডযুক্ত শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলে নিক্ষেপ করেছে। এসব অস্ত্রের কিছু অংশ মাটিতে পড়ার পরও অবিস্ফোরিত থেকে যায়। ফলে পরে অসতর্কভাবে সেগুলোর সংস্পর্শে আসা মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে সোমবারের মতো প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ তুলনামূলক বিরল।

স্থলমাইনের মতো না হলেও অবিস্ফোরিত ক্লাস্টার বোমা গোলান মালভূমি ও পশ্চিম তীরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপদ সৃষ্টি করছে। এ ধরনের অস্ত্র পড়ে থাকতে পারে—এমন সব জায়গা বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক অস্ত্র বছরের পর বছর অচেনা অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে। পরে কেউ সেগুলো স্পর্শ করলে বা নাড়াচাড়া করলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এই হুমকির বিস্তৃতি নির্ভরযোগ্যভাবে নিরূপণ করারও কোনো উপায় নেই।

অবিস্ফোরিত অস্ত্রের ধরনও একেক রকম। কিছু অস্ত্র রকেট, গ্রেনেড কিংবা শঙ্কু আকৃতির ওয়ারহেড হিসেবে চেনা যায়। আবার কিছু অস্ত্র দেখতে ছোট ধাতব পাত্রের মতো সাধারণ হতে পারে। অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী বিস্ফোরণের শক্তি ভিন্ন হলেও ক্লাস্টার বোমা থেকে ছড়িয়ে পড়া ছোট অংশও প্রাণঘাতী আঘাত হানতে পারে।

অবিস্ফোরিত অস্ত্রের কারণে বেসামরিক মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত আগস্টে উত্তরাঞ্চলীয় শহর মেতুলার কাছে একটি কৃষিজমিতে পুরোনো বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হলে ছয় বিদেশি শ্রমিক আহত হন। গত তিন বছরে ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তরাঞ্চলীয় কিবুতজ ইরোনের কাছে একটি বাগানে হিজবুল্লাহর আগে নিক্ষেপ করা একটি অস্ত্র বিস্ফোরিত হলে থাইল্যান্ডের ২৭ বছর বয়সী এক শ্রমিক নিহত হন এবং আরেকজন আহত হন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জর্ডান উপত্যকায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রের কাছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আগে নিক্ষেপ করা অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিস্ফোরণে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরও দুই শিশু আহত হয়।

ইসরাইলে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণের দায়িত্ব তিনটি সংস্থার মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল মাইন অ্যাকশন অথরিটি, সামরিক বাহিনী ও পুলিশ। ২০১১ সালের মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ আইন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংস্থাটির দায়িত্ব হলো মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র থাকা এলাকা চিহ্নিত করে অপসারণের পরিকল্পনা করা এবং কার্যক্রম পরিচালনা করা। নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়াও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

তবে মঙ্গলবার আর্মি রেডিওর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাণঘাতী এই ঘটনার দায় নিতে অস্বীকার করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের ফলে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা ন্যাশনাল মাইন অ্যাকশন অথরিটির দায়িত্ব নয়; এ কাজ পুলিশের।

সোমবারের বিস্ফোরণের ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইসরাইল পুলিশের কমিশনার ড্যানি লেভি। তবে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণে পুলিশের দায়িত্বের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি জানান, শিক্ষাসফরটির জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময় বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষকে বাড়িতে ফিরতে সহায়তা করতে উত্তর ইসরাইলের প্রায় ৪০টি জনপদে বিস্তৃত অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছিল ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল সামরিক সরঞ্জাম সরানো, বর্জ্য পরিষ্কার করা এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা। তবে এ বছর হিজবুল্লাহর সঙ্গে সর্বশেষ দফার লড়াইয়ের পর একই ধরনের অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়নি আইডিএফ।

ইসরাইল ট্রেইল ধরে তিন দিনের শিক্ষাসফরটির অনুমোদন দিয়েছিল দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই এলাকায় ইহুদি জাতীয় তহবিল কেকেএল-জেএনএফের টাঙানো একটি সাইনবোর্ডে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে বন ও ক্যাম্পসাইটে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকার কথা বলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে সংস্থাটির ওয়েবসাইটেও একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

মঙ্গলবার আর্মি রেডিওকে কেকেএল-জেএনএফের চেয়ারম্যান আইয়াল অস্ট্রিনস্কি বলেন, পথটি বন্ধ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন সেখানে শিক্ষাসফরের অনুমতি দিয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাঁর দাবি, ইসরাইল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব নেচার পরিচালিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অপারেশনস রুমকে আগেই জানানো হয়েছিল যে এলাকাটি বন্ধ।

এক বিবৃতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শিক্ষাসফরের জন্য অনুমোদিত পথটি কোনো নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে পড়েনি। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলটি হয়তো নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়েছিল। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সফরের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তাবিষয়ক স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বা অবিস্ফোরিত অস্ত্র স্পর্শ না করা এবং এ ধরনের কোনো বস্তু দেখামাত্র কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশও ছিল।

ইসরাইলে অবিস্ফোরিত অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা অজানা। বিশেষ করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত বনাঞ্চল ও কৃষিশ্রমিকদের কাজের মাঠে এসব অস্ত্রের উপস্থিতি এবং সীমিত অপসারণ কার্যক্রমের কারণে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে অনেক অস্ত্র মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়, ফলে সেগুলো সহজে চোখে পড়ে না। এতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দা ও শ্রমিকদের জন্য প্রাণঘাতী বিপদ রয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ইসরাইলে বিস্ফোরণে নিহত শিক্ষার্থী

আপডেট সময় ১০:৩৮:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

 

বছরের পর বছর সংঘাতের পর ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলাবারুদের ভয়াবহতা আবারও সামনে এসেছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে লেবানন সীমান্তের কাছে শিক্ষাসফরে গিয়ে অবিস্ফোরিত ক্লাস্টার বোমার একটি অংশের বিস্ফোরণে ১৩ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আরও ২৪ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) লেবানন সীমান্তবর্তী একটি বনাঞ্চলে এ ঘটনা ঘটে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাফতালি মাউন্টেনস ফরেস্টের একটি প্রাকৃতিক পথ ধরে হাঁটার সময় ওআরটি মাআলত স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলটি অবিস্ফোরিত বোমার মুখোমুখি হয়। পথটি ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন  মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তেলের দামে ব্যারেল ছাড়াল ১১১ ডলার

ঘটনাস্থলের ছবি বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, রামিম রিজ এলাকার ওই পথে হাঁটার সময় এক শিক্ষার্থী মাটিতে বা পথের পাশে পড়ে থাকা হিজবুল্লাহর একটি সাবমিউনিশন দেখতে পায়। সেটি তুলে নেওয়ার একপর্যায়ে ছোট বোমার অংশটি বিস্ফোরিত হয়। এতে নবম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী নিহত হয় এবং আরও ২৪ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হন।

ইসরাইলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ধারণা, বিভিন্ন সময়ের সংঘর্ষের পর দেশটির প্রায় সব অঞ্চলেই শত শত, এমনকি হাজার হাজার অবিস্ফোরিত অস্ত্র ছড়িয়ে থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে কয়েক ডজন বিআরবি১—যা এ-০৯ নামেও পরিচিত—সাবমিউনিশন বহনকারী গ্র্যাড রকেট নিক্ষেপ করে। এসব রকেট বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্লাস্টার বোমার অংশ ছড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো মাটিতে পড়েও বিস্ফোরিত হয় না।

হিজবুল্লাহ ছাড়াও ইরান ও ইয়েমেনভিত্তিক তাদের মিত্রগোষ্ঠী হুথিরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডযুক্ত শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলে নিক্ষেপ করেছে। এসব অস্ত্রের কিছু অংশ মাটিতে পড়ার পরও অবিস্ফোরিত থেকে যায়। ফলে পরে অসতর্কভাবে সেগুলোর সংস্পর্শে আসা মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে সোমবারের মতো প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ তুলনামূলক বিরল।

স্থলমাইনের মতো না হলেও অবিস্ফোরিত ক্লাস্টার বোমা গোলান মালভূমি ও পশ্চিম তীরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপদ সৃষ্টি করছে। এ ধরনের অস্ত্র পড়ে থাকতে পারে—এমন সব জায়গা বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক অস্ত্র বছরের পর বছর অচেনা অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে। পরে কেউ সেগুলো স্পর্শ করলে বা নাড়াচাড়া করলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এই হুমকির বিস্তৃতি নির্ভরযোগ্যভাবে নিরূপণ করারও কোনো উপায় নেই।

অবিস্ফোরিত অস্ত্রের ধরনও একেক রকম। কিছু অস্ত্র রকেট, গ্রেনেড কিংবা শঙ্কু আকৃতির ওয়ারহেড হিসেবে চেনা যায়। আবার কিছু অস্ত্র দেখতে ছোট ধাতব পাত্রের মতো সাধারণ হতে পারে। অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী বিস্ফোরণের শক্তি ভিন্ন হলেও ক্লাস্টার বোমা থেকে ছড়িয়ে পড়া ছোট অংশও প্রাণঘাতী আঘাত হানতে পারে।

অবিস্ফোরিত অস্ত্রের কারণে বেসামরিক মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত আগস্টে উত্তরাঞ্চলীয় শহর মেতুলার কাছে একটি কৃষিজমিতে পুরোনো বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হলে ছয় বিদেশি শ্রমিক আহত হন। গত তিন বছরে ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তরাঞ্চলীয় কিবুতজ ইরোনের কাছে একটি বাগানে হিজবুল্লাহর আগে নিক্ষেপ করা একটি অস্ত্র বিস্ফোরিত হলে থাইল্যান্ডের ২৭ বছর বয়সী এক শ্রমিক নিহত হন এবং আরেকজন আহত হন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জর্ডান উপত্যকায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রের কাছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আগে নিক্ষেপ করা অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিস্ফোরণে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরও দুই শিশু আহত হয়।

ইসরাইলে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণের দায়িত্ব তিনটি সংস্থার মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল মাইন অ্যাকশন অথরিটি, সামরিক বাহিনী ও পুলিশ। ২০১১ সালের মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ আইন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংস্থাটির দায়িত্ব হলো মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র থাকা এলাকা চিহ্নিত করে অপসারণের পরিকল্পনা করা এবং কার্যক্রম পরিচালনা করা। নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়াও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

তবে মঙ্গলবার আর্মি রেডিওর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাণঘাতী এই ঘটনার দায় নিতে অস্বীকার করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের ফলে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা ন্যাশনাল মাইন অ্যাকশন অথরিটির দায়িত্ব নয়; এ কাজ পুলিশের।

সোমবারের বিস্ফোরণের ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইসরাইল পুলিশের কমিশনার ড্যানি লেভি। তবে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণে পুলিশের দায়িত্বের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি জানান, শিক্ষাসফরটির জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময় বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষকে বাড়িতে ফিরতে সহায়তা করতে উত্তর ইসরাইলের প্রায় ৪০টি জনপদে বিস্তৃত অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছিল ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল সামরিক সরঞ্জাম সরানো, বর্জ্য পরিষ্কার করা এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা। তবে এ বছর হিজবুল্লাহর সঙ্গে সর্বশেষ দফার লড়াইয়ের পর একই ধরনের অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়নি আইডিএফ।

ইসরাইল ট্রেইল ধরে তিন দিনের শিক্ষাসফরটির অনুমোদন দিয়েছিল দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই এলাকায় ইহুদি জাতীয় তহবিল কেকেএল-জেএনএফের টাঙানো একটি সাইনবোর্ডে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে বন ও ক্যাম্পসাইটে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকার কথা বলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে সংস্থাটির ওয়েবসাইটেও একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

মঙ্গলবার আর্মি রেডিওকে কেকেএল-জেএনএফের চেয়ারম্যান আইয়াল অস্ট্রিনস্কি বলেন, পথটি বন্ধ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন সেখানে শিক্ষাসফরের অনুমতি দিয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাঁর দাবি, ইসরাইল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব নেচার পরিচালিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অপারেশনস রুমকে আগেই জানানো হয়েছিল যে এলাকাটি বন্ধ।

এক বিবৃতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শিক্ষাসফরের জন্য অনুমোদিত পথটি কোনো নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে পড়েনি। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলটি হয়তো নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়েছিল। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সফরের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তাবিষয়ক স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বা অবিস্ফোরিত অস্ত্র স্পর্শ না করা এবং এ ধরনের কোনো বস্তু দেখামাত্র কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশও ছিল।

ইসরাইলে অবিস্ফোরিত অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা অজানা। বিশেষ করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত বনাঞ্চল ও কৃষিশ্রমিকদের কাজের মাঠে এসব অস্ত্রের উপস্থিতি এবং সীমিত অপসারণ কার্যক্রমের কারণে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে অনেক অস্ত্র মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়, ফলে সেগুলো সহজে চোখে পড়ে না। এতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দা ও শ্রমিকদের জন্য প্রাণঘাতী বিপদ রয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল।