ইউরোপজুড়ে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, জ্বালানি ও বাণিজ্যে বাড়ছে সংকট
- আপডেট সময় ০৭:৫০:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
- / 2
দাবদাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রভাবে ইউরোপের প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত কমে যাচ্ছে। দানিউব ও রাইন নদীতে রেকর্ড নিম্ন জলস্তরের কারণে জ্বালানি উৎপাদন, নৌপরিবহন, বাণিজ্য, পর্যটন এবং পরিবেশ—সব খাতেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আরও ঘন ঘন এবং তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে।
উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, একসময় পানিতে পরিপূর্ণ ইউরোপের বিস্তীর্ণ নদীপথের বড় অংশ এখন শুকিয়ে গেছে। পানি কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশের বালুচর ও তীরভূমির বড় অংশ দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৩ সালের স্বাভাবিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে এবারের পরিবর্তনকে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়নের শিকার মহাদেশ হিসেবে ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও অতিরিক্ত গরম মাটি ও নদীর আর্দ্রতা দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দানিউব ও রাইন নদী। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে দানিউব নদীর পানির স্তর নেমে এসেছে মাত্র ৪ ইঞ্চিতে, যা ২০১৮ সালের আগের সর্বনিম্ন রেকর্ডেরও নিচে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে নতুন তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি উৎপাদনে চাপ
দানিউব নদীর পানি কমে যাওয়ায় হাঙ্গেরির পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে। দেশটির মোট বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেক উৎপাদনকারী এই কেন্দ্রটি বর্তমানে সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। পানির ঘাটতির কারণে অধিকাংশ চুল্লি বন্ধ রাখতে হয়েছে। পানি আরও কমে গেলে পুরো কেন্দ্রটির কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে রোমানিয়াতেও। দানিউবের পানিপ্রবাহ সচল রাখতে দেশটির কর্তৃপক্ষ নদীপথে প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
পর্যটন ও ইতিহাসে প্রভাব
নদীর পানি কমে যাওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন রিভার ক্রুজ বাতিল করা হয়েছে। বুলগেরিয়ায় একটি প্রমোদতরী বালুচরে আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে, নদীর তলদেশ থেকে বেরিয়ে আসছে বহু পুরোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এর মধ্যে রয়েছে একটি প্রাচীন ম্যামথের দেহাবশেষ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ডুবে যাওয়া একটি নাৎসি যুদ্ধজাহাজ।
বাণিজ্যেও বড় ধাক্কা
রাইন নদীর পানি কমে যাওয়ায় ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। বালুচরে আটকে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে অনেক মালবাহী জাহাজকে স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক কম পণ্য বহন করতে হচ্ছে। ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হয়েছে।
জার্মানির বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নদীপথের পরিবর্তে রেল ও সড়কপথে পণ্য পরিবহনের দিকে ঝুঁকছে। ইতালির পো এবং ফ্রান্সের লোয়ার নদীতেও অস্বাভাবিকভাবে পানি কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আরও গভীর সংকটের সতর্কবার্তা
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতের আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের ভাষ্য, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অব্যাহত থাকলে ইউরোপে নদীর জলস্তর কমে যাওয়ার নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার পাশাপাশি দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স ও এপি।

























