ঢাকা ১০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে বদলে যাচ্ছে পুরানো ধারণা

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৯:০১:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
  • / 19

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা নতুন গবেষণায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মহাকাশ থেকে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান পৃথিবীতে এসেছিল বলে যে তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নাও হতে পারে। নতুন কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, প্রাচীন পৃথিবীতে ধূমকেতুর আঘাতের সময় সৃষ্ট প্রচণ্ড তাপ ও চাপে সেগুলোর বহন করা অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, ধূমকেতুর আঘাতের তীব্রতার কারণে প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত কম।

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক রিচার্ড অ্যানসলোর নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন দল ধূমকেতুর সৃষ্টি ও বিবর্তনের আধুনিক মডেল ব্যবহার করে প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ নিয়ে এক লাখবার কম্পিউটার সিমুলেশন চালায়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ৪০০ কোটিরও বেশি বছর আগে পৃথিবী একাধিক ধূমকেতুর আঘাতের শিকার হয়েছিল। ওই সময়ে ১০০ মিটারের বেশি ব্যাসের এক লাখেরও বেশি ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে থাকতে পারে। তবে এসব সংঘর্ষের অধিকাংশই প্রাণ সৃষ্টির উপযোগী জৈব অণু টিকে থাকার জন্য অতিরিক্ত শক্তিশালী ছিল।

রিচার্ড অ্যানসলো জানান, প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ সম্পর্কে পাওয়া তথ্য বিবেচনায় নিয়ে পরিচালিত সিমুলেশনে গড়ে কোনো সংঘর্ষকেই সফল হিসেবে পাওয়া যায়নি। ধূমকেতুগুলো এত বেশি গতিতে পৃথিবীতে আঘাত করত যে, সেগুলোর বহন করা জৈব অণু অক্ষত অবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল খুবই কম।

সিমুলেশনের ৫৪ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। বাকি ৪৬ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্তত একটি সংঘর্ষের সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে খুব অল্পসংখ্যক সিমুলেশনে সর্বোচ্চ তিনটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলে উঠে এসেছে।

তবে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছেন না গবেষকেরা। তাঁদের মতে, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে ধূমকেতুর আঘাত সফল হতে পারত। সে ক্ষেত্রে সংঘর্ষের স্থানটি এমন হওয়া প্রয়োজন ছিল, যেখানে আগে থেকেই তরল পানি এবং প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান উপস্থিত ছিল।

প্রাণ সৃষ্টির উপাদান নিয়ে নতুন প্রশ্ন

গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হাইড্রোজেন সায়ানাইড বা এইচসিএন নামের একটি রাসায়নিক যৌগকে। প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই যৌগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। হ্যালি ও হেল-বপসহ কয়েক ডজন ধূমকেতুতে এর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

হাইড্রোজেন, কার্বন ও নাইট্রোজেন দিয়ে গঠিত হাইড্রোজেন সায়ানাইড পানির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যামিনো অ্যাসিড হচ্ছে প্রোটিন তৈরির মৌলিক উপাদান।

কিন্তু ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার সময় প্রচণ্ড তাপ ও চাপ তৈরি হয়। এতে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক যৌগ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবার কোনোভাবে উপাদানটি অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছালেও প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় এর উপস্থিতি নিশ্চিত নয়। সমুদ্রে ধূমকেতুর আঘাত হলে যৌগটি দ্রুত পানিতে মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অ্যানসলোর মতে, প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য ফসফরাস ও সালফারযুক্ত যৌগসহ আরও অনেক উপাদান প্রয়োজন। কিন্তু ধূমকেতুতে এসব উপাদানের নিয়মিত উপস্থিতি পাওয়া যায় না। ফলে কোনো ধূমকেতু একটি প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান নিয়ে এলেও একই স্থানে অন্য উপাদানগুলো পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না।

গ্রহাণু ও প্রাচীন পৃথিবী নিয়ে বিকল্প ব্যাখ্যা

ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৃথিবীতে আসার তত্ত্ব নতুন গবেষণায় দুর্বল হয়ে পড়লেও বিকল্প ব্যাখ্যা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা হলো, প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশেই প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় অণু তৈরি হয়ে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই এ সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা চলছে।

এ ছাড়া প্রাণ সৃষ্টির উপাদানের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে গ্রহাণুর কথাও বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। ধূমকেতুর তুলনায় গ্রহাণু সাধারণত কম গতিতে পৃথিবীতে আঘাত হানে। প্রাচীন পৃথিবীতে এগুলোর সংখ্যাও বেশি ছিল। ফলে গ্রহাণুর বহন করা জৈব উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

গ্রহাণু বেন্নু ও রিউগু থেকে সংগ্রহ করা নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রোটিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের সন্ধান পেয়েছেন। এসব আবিষ্কার পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তিতে মহাকাশ থেকে আসা রাসায়নিক উপাদানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।

মঙ্গলে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৌঁছানোর সম্ভাবনা

নতুন গবেষণায় পৃথিবীর পাশাপাশি প্রাচীন মঙ্গলের পরিবেশ নিয়েও একটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের ধারণা, পৃথিবীর তুলনায় প্রাচীন মঙ্গলে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৌঁছানোর পরিবেশ বেশি অনুকূল থাকতে পারে।

রিচার্ড অ্যানসলো বলেন, মঙ্গল পৃথিবীর তুলনায় অনেক ছোট এবং সূর্য থেকে বেশি দূরে অবস্থিত। এ কারণে সেখানে ধূমকেতুর আঘাতের গতি তুলনামূলক কম ছিল। পৃথিবীতে যে সংঘর্ষের ফলে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, মঙ্গলে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না-ও হতে পারে।

গবেষকদের এই ধারণা লাল গ্রহে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি নাকচ নয়

নতুন গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হলেও প্রাণের উৎপত্তিতে ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি বাতিল করতে রাজি নন অন্য বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, ধূমকেতু থেকে পৃথিবীতে জৈব উপাদান পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি আরও বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কুইনি চ্যান বলেন, ধূমকেতু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগেই হাইড্রোজেন সায়ানাইড বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। এর ফলে অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব যৌগ তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল হওয়ায় সংঘর্ষের পরও টিকে থাকতে পারে।

তাঁর মতে, অক্ষত হাইড্রোজেন সায়ানাইড পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ধূমকেতুর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ সরবরাহে তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের অ্যালবিয়ন কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিকোল জেলনারও গবেষণার ফলাফলে বিস্মিত নন। তবে তিনিও পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তিতে ধূমকেতুর সম্ভাব্য অবদান পুরোপুরি বাতিল করার পক্ষে নন।

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে বদলে যাচ্ছে পুরানো ধারণা

আপডেট সময় ০৯:০১:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা নতুন গবেষণায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মহাকাশ থেকে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান পৃথিবীতে এসেছিল বলে যে তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নাও হতে পারে। নতুন কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, প্রাচীন পৃথিবীতে ধূমকেতুর আঘাতের সময় সৃষ্ট প্রচণ্ড তাপ ও চাপে সেগুলোর বহন করা অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, ধূমকেতুর আঘাতের তীব্রতার কারণে প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত কম।

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক রিচার্ড অ্যানসলোর নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন দল ধূমকেতুর সৃষ্টি ও বিবর্তনের আধুনিক মডেল ব্যবহার করে প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ নিয়ে এক লাখবার কম্পিউটার সিমুলেশন চালায়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ৪০০ কোটিরও বেশি বছর আগে পৃথিবী একাধিক ধূমকেতুর আঘাতের শিকার হয়েছিল। ওই সময়ে ১০০ মিটারের বেশি ব্যাসের এক লাখেরও বেশি ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে থাকতে পারে। তবে এসব সংঘর্ষের অধিকাংশই প্রাণ সৃষ্টির উপযোগী জৈব অণু টিকে থাকার জন্য অতিরিক্ত শক্তিশালী ছিল।

রিচার্ড অ্যানসলো জানান, প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ সম্পর্কে পাওয়া তথ্য বিবেচনায় নিয়ে পরিচালিত সিমুলেশনে গড়ে কোনো সংঘর্ষকেই সফল হিসেবে পাওয়া যায়নি। ধূমকেতুগুলো এত বেশি গতিতে পৃথিবীতে আঘাত করত যে, সেগুলোর বহন করা জৈব অণু অক্ষত অবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল খুবই কম।

সিমুলেশনের ৫৪ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। বাকি ৪৬ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্তত একটি সংঘর্ষের সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে খুব অল্পসংখ্যক সিমুলেশনে সর্বোচ্চ তিনটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলে উঠে এসেছে।

তবে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছেন না গবেষকেরা। তাঁদের মতে, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে ধূমকেতুর আঘাত সফল হতে পারত। সে ক্ষেত্রে সংঘর্ষের স্থানটি এমন হওয়া প্রয়োজন ছিল, যেখানে আগে থেকেই তরল পানি এবং প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান উপস্থিত ছিল।

প্রাণ সৃষ্টির উপাদান নিয়ে নতুন প্রশ্ন

গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হাইড্রোজেন সায়ানাইড বা এইচসিএন নামের একটি রাসায়নিক যৌগকে। প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই যৌগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। হ্যালি ও হেল-বপসহ কয়েক ডজন ধূমকেতুতে এর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

হাইড্রোজেন, কার্বন ও নাইট্রোজেন দিয়ে গঠিত হাইড্রোজেন সায়ানাইড পানির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যামিনো অ্যাসিড হচ্ছে প্রোটিন তৈরির মৌলিক উপাদান।

কিন্তু ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার সময় প্রচণ্ড তাপ ও চাপ তৈরি হয়। এতে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক যৌগ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবার কোনোভাবে উপাদানটি অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছালেও প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় এর উপস্থিতি নিশ্চিত নয়। সমুদ্রে ধূমকেতুর আঘাত হলে যৌগটি দ্রুত পানিতে মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অ্যানসলোর মতে, প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য ফসফরাস ও সালফারযুক্ত যৌগসহ আরও অনেক উপাদান প্রয়োজন। কিন্তু ধূমকেতুতে এসব উপাদানের নিয়মিত উপস্থিতি পাওয়া যায় না। ফলে কোনো ধূমকেতু একটি প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান নিয়ে এলেও একই স্থানে অন্য উপাদানগুলো পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না।

গ্রহাণু ও প্রাচীন পৃথিবী নিয়ে বিকল্প ব্যাখ্যা

ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৃথিবীতে আসার তত্ত্ব নতুন গবেষণায় দুর্বল হয়ে পড়লেও বিকল্প ব্যাখ্যা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা হলো, প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশেই প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় অণু তৈরি হয়ে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই এ সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা চলছে।

এ ছাড়া প্রাণ সৃষ্টির উপাদানের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে গ্রহাণুর কথাও বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। ধূমকেতুর তুলনায় গ্রহাণু সাধারণত কম গতিতে পৃথিবীতে আঘাত হানে। প্রাচীন পৃথিবীতে এগুলোর সংখ্যাও বেশি ছিল। ফলে গ্রহাণুর বহন করা জৈব উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

গ্রহাণু বেন্নু ও রিউগু থেকে সংগ্রহ করা নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রোটিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের সন্ধান পেয়েছেন। এসব আবিষ্কার পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তিতে মহাকাশ থেকে আসা রাসায়নিক উপাদানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।

মঙ্গলে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৌঁছানোর সম্ভাবনা

নতুন গবেষণায় পৃথিবীর পাশাপাশি প্রাচীন মঙ্গলের পরিবেশ নিয়েও একটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের ধারণা, পৃথিবীর তুলনায় প্রাচীন মঙ্গলে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৌঁছানোর পরিবেশ বেশি অনুকূল থাকতে পারে।

রিচার্ড অ্যানসলো বলেন, মঙ্গল পৃথিবীর তুলনায় অনেক ছোট এবং সূর্য থেকে বেশি দূরে অবস্থিত। এ কারণে সেখানে ধূমকেতুর আঘাতের গতি তুলনামূলক কম ছিল। পৃথিবীতে যে সংঘর্ষের ফলে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, মঙ্গলে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না-ও হতে পারে।

গবেষকদের এই ধারণা লাল গ্রহে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি নাকচ নয়

নতুন গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হলেও প্রাণের উৎপত্তিতে ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি বাতিল করতে রাজি নন অন্য বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, ধূমকেতু থেকে পৃথিবীতে জৈব উপাদান পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি আরও বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কুইনি চ্যান বলেন, ধূমকেতু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগেই হাইড্রোজেন সায়ানাইড বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। এর ফলে অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব যৌগ তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল হওয়ায় সংঘর্ষের পরও টিকে থাকতে পারে।

তাঁর মতে, অক্ষত হাইড্রোজেন সায়ানাইড পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ধূমকেতুর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ সরবরাহে তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের অ্যালবিয়ন কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিকোল জেলনারও গবেষণার ফলাফলে বিস্মিত নন। তবে তিনিও পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তিতে ধূমকেতুর সম্ভাব্য অবদান পুরোপুরি বাতিল করার পক্ষে নন।