মধ্যবর্তী ভোটে কঠিন চ্যালেঞ্জে ট্রাম্প
- আপডেট সময় ১২:৫২:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / 25
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ দলটির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। আগামী মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নির্বাচন সামনে রেখে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে শেষ মুহূর্তে প্রচার জোরদার করেছেন ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতারা।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও শাসনকার্যের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত এ ভোটে ক্ষমতাসীন দলের আসন হারানোর প্রবণতা দীর্ঘদিনের। ফলে ঐতিহাসিক নির্বাচনী সমীকরণ এবারও রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
১৯৪৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ১৮টিতেই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০১০ সালের নির্বাচন। ওই সময় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৬৪টি আসন হারায়। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের দল হারিয়েছিল ৫৪টি আসন।
২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৪২টি আসন হারায়। এর ফলে কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যায়।
নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পাওয়ার পরও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে পরবর্তী মধ্যবর্তী নির্বাচনে সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। দুই বছরের শাসনামলে অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোসের জনমত জরিপেও রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন ছিল ৩২ শতাংশ। এর আগের সপ্তাহে তাঁর জনপ্রিয়তা নেমে এসেছিল ৩১ শতাংশে, যা দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর সর্বনিম্ন পর্যায়।
জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ওই দিন নির্বাচন হলে তাঁরা কোন দলকে ভোট দেবেন। ৪৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের এবং ৩৬ শতাংশ রিপাবলিকানদের পক্ষে মত দেন। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান ছিল ১১ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে জনমত জরিপের ফল সরাসরি নির্বাচনের ফল নির্দেশ করে না। চূড়ান্ত ভোটের ফল জরিপের চিত্র থেকে ভিন্ন হতে পারে।
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের অসন্তোষ বাড়ছে।
রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে তাঁদের আয়ের তুলনায় পণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। রিপাবলিকান ভোটারদের একাংশও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্রনীতিও এবার অর্থনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও তেলের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে পররাষ্ট্রনীতি প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে না। তবে ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাবে পণ্যের দাম বাড়ায় এবার পররাষ্ট্রনীতি অর্থনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে রিপাবলিকান প্রার্থীরা বাড়তি রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই রিপাবলিকানদের প্রধান লক্ষ্য। ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে বর্তমানে দলটির আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন, যিনি নিয়মিত রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোট দেন।
প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে এবারের নির্বাচনে ৪৩৫টি আসনেই ভোট হবে। তবে অধিকাংশ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ অনেক আসনে নির্দিষ্ট দলের সমর্থন এতটাই শক্তিশালী যে বিজয়ী প্রায় নিশ্চিত বলে বিবেচিত হয়।
নির্বাচনী প্রচার ও ভোটের হিসাব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাত্র ১৮টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। এসব আসনের মধ্যে ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকান এবং চারটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে।
ডেমোক্র্যাটরা এই ১৮টি আসনের একটিতেও জয় না পেলেও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দলটির অনুকূলে থাকা বা কিছুটা এগিয়ে থাকা ৩৬টি আসন ধরে রাখতে হবে।
অন্যদিকে সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান তুলনামূলক শক্ত। ১০০ সদস্যের এ কক্ষে দলটির আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি। বাকি দুটি আসনে স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন, যাঁরা ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেন।
সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি দুই বছর পর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এবারের ভোটে ৩৫টি সিনেট আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে মাত্র সাতটি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব আসনের ছয়টি বর্তমানে রিপাবলিকান এবং একটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে।
সোমবার (২ নভেম্বর) রয়টার্সে প্রকাশিত নির্বাচনী বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে ডেমোক্র্যাটরা আশাবাদী। তবে সিনেটের লড়াই তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ওহাইও, আইওয়া, আলাস্কা, টেক্সাস, কানসাস, মিশিগান ও মেইনের ফল সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জরিপে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটারদের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে ডেমোক্র্যাটদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতারা আশা করছেন, নির্বাচনের দিন ট্রাম্পের সমর্থকরা বিপুলসংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে যাবেন। দলটির প্রচারশিবির মনে করছে, শেষ মুহূর্তের প্রচার এবং ট্রাম্পের সরাসরি অংশগ্রহণ রিপাবলিকান ভোটারদের সক্রিয় করতে পারে।
নির্বাচনী প্রচারে রিপাবলিকানদের আর্থিক সুবিধাও রয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দলীয় কমিটি ও সমর্থক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রচারে দলটি কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠন ম্যাগা ইনকরপোরেটেডও তাঁর পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। তবে প্রচারে অর্থের সুবিধা ভোটারদের অসন্তোষ দূর করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাধা বাড়তে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে। অভিবাসননীতি, ইরান যুদ্ধ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারি ব্যয় নিয়ে জবাবদিহির চাপও বাড়তে পারে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা ও ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও প্রশাসন বাধার মুখে পড়তে পারে।
তবে কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের সব নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা থাকে। ফলে নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচি সীমিত করতে পারে, তবে তাঁর প্রশাসনের সব সিদ্ধান্ত বন্ধ করে দিতে পারবে না।
সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা ও বিবিসি।























