গণভোটে নিরঙ্কুশ ‘হ্যাঁ’: রাষ্ট্রকাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ
- আপডেট সময় ১১:৪১:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 61
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত গণভোটে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবে স্পষ্ট সমর্থন দিয়েছে ভোটাররা। ফল ঘোষণার পর দেখা গেছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। এর ফলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি সংস্কার বাস্তবায়নের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হলো।
ফলাফল ঘোষণা করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল উল্লেখযোগ্য। মোট ভোটারের একটি বড় অংশ সরাসরি মত দিয়েছে, যার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে।
কী ধরনের পরিবর্তন আসছে
গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবগুলো কার্যকর হলে দেশের শাসনব্যবস্থায় কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাবে।
১. নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য
দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর হাতে অধিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকার সমালোচনা ছিল। নতুন ব্যবস্থায় সেই কাঠামোয় পরিবর্তন এনে রাষ্ট্রপতির ভূমিকাকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একক আধিপত্য কমে আসবে এবং জবাবদিহিতা বাড়বে।
২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ
বর্তমান এককক্ষবিশিষ্ট সংসদের পরিবর্তে দুই কক্ষের আইনসভা গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। একটি কক্ষ সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে, অন্যটি অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। আইন পাসের আগে দুই স্তরে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
এই কাঠামো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান। যেমন, ভারত-এ লোকসভা ও রাজ্যসভা এবং পাকিস্তান-এ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সিনেট রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষ সরাসরি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এবং উচ্চকক্ষ প্রদেশ বা বিশেষ স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করে।
৩. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সংশোধনের ফলে এমপিরা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দলের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন। এতে সংসদীয় বিতর্ক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
৪. সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া
নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার কথা বলা হয়েছে। একটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধান বা সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।
৫. মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা
বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, ডিজিটাল পরিসরে নাগরিক অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে আরও শক্ত ভিত্তি দেওয়ার কথা রয়েছে। ভবিষ্যতে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এসব অধিকারের সীমাবদ্ধতা আরোপ কঠিন হবে।
৬. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এই গণভোটকে তার বাস্তব রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ যে প্রস্তাবনা তৈরি করে, তার মধ্য থেকেই সংবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গণভোটে তোলা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ভোট কেবল সরকার বা প্রতিনিধির পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার ধরনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন নজর থাকবে, গেজেট প্রকাশ ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এসব প্রস্তাব কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয় এবং নতুন সংসদ কীভাবে এই পরিবর্তনগুলো কার্যকর করে।























