ঢাকা ০৪:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

দুই পা হারিয়ে গর্তে ৮ মাস, ড্রোনে উদ্ধার ইউক্রেনীয় সেনা

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৩:৩৫:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / 34

ছবি সংগৃহীত

 

ড্রোন হামলায় দুই পা হারানোর পর ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্কুলের বয়লারঘরের নিচে ছোট্ট গর্তে আট মাসেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। চারপাশে রুশ ড্রোনের নজরদারি থাকায় তাঁকে উদ্ধার করতে বারবার ব্যর্থ হন সহযোদ্ধারা। শেষ পর্যন্ত গত ৪ অক্টোবর একটি ভারী মালবাহী ড্রোনের সাহায্যে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে ঝুলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কোনো সেনাকে ড্রোনের সাহায্যে এভাবে আকাশপথে উদ্ধারের প্রথম ঘটনা এটি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ভ্লাসেনকো। তখন তাঁর দুই পায়ের কাটা অংশ ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছিল।

আরও পড়ুন  রুশ ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের সুমিতে শিশু-নারীসহ নিহত ৩

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। জানতাম, আর কোনো আশা নেই।’

ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য ভ্লাসেনকো গত বছরের মে মাসে খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারির একটি অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ‘বাসকি’ সাংকেতিক নামে পরিচিত আরেক সেনাসদস্য।

দুই সেনাকে একটি ছোট মাটির বাংকারে থাকতে হতো। প্রতিদিন ড্রোনের মাধ্যমে তাঁদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল।

তবে ওই অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ভ্লাসেনকোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিতে যাওয়া দুই সেনা নিহত হন। পরে তাঁদের মরদেহ উদ্ধারে গিয়ে আরও দুই সেনা প্রাণ হারান।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’

প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাঁদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা কাছের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।

একপর্যায়ে শুকনো কাপড় ও খাবারের একটি প্যাকেট সংগ্রহ করতে বাইরে বের হন তাঁরা। এ সময় রাশিয়ার একটি নজরদারি ড্রোন তাঁদের শনাক্ত করে। পরে আরেকটি রুশ ড্রোন হামলা চালালে নিহত হন বাসকি। দিনটি ছিল তাঁর ৫০তম জন্মদিন।

ওই হামলায় ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের পাতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণের পর পড়ে গিয়ে ডান পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি। চলাফেরার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলায় স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে থাকা ছোট একটি গর্তে আশ্রয় নেন।

গর্তটির আয়তন ছিল প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার। সেখানে অবস্থান করেই বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাঁ পায়ের ক্ষত আরও খারাপ হতে থাকে। ডান পায়ের নিচের অংশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাড় বেরিয়ে আসে।

একপর্যায়ে বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের ছুরি দিয়ে ডান পায়ের পাতাটিও কেটে ফেলেন ভ্লাসেনকো। রক্তপাত বন্ধ করতে ব্যবহার করেন টুর্নিকেট।

তিনি বলেন, ‘আমাকে পায়ের পাতাটি কেটে ফেলতেই হয়েছিল। সেটি আমার পেছনে টেনে টেনে চলছিল। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’

ভ্লাসেনকোর ভাষায়, ‘তখন আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।’

আট মাসেরও বেশি সময় গর্তে

ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের নিচে ছোট্ট গর্তটিতে আট মাসেরও বেশি সময় আটকে ছিলেন ভ্লাসেনকো। সম্মুখসারিতে তাঁর মোট অবস্থানের সময় ছিল ৪৯১ দিন।

অঞ্চলটি সেনাদের কাছে ‘কিল জোন’ নামে পরিচিত। আকাশে অসংখ্য ড্রোন টহল দেওয়ায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আহত সেনাদের পিকআপ বা সাঁজোয়া যান দিয়ে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

ইউক্রেনীয় সেনারা মাটিতে চলাচলকারী চালকবিহীন যান ব্যবহার করেও ভ্লাসেনকোকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছানোর জন্য পাঠানো দুটি যানই রুশ ড্রোনের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।

উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ সাংকেতিক নামের এক কর্মকর্তা জানান, একপর্যায়ে তাঁদের মনে হচ্ছিল, ভ্লাসেনকোকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের নজরে আসে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি নতুন ভারী মালবাহী ড্রোন। সেটিকে ব্যবহার করেই সেনাটিকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়।

ছয় প্রপেলারের ড্রোনে উদ্ধার অভিযান

ড্রোনটিতে ছয়টি উল্লম্ব রোটর রয়েছে। কালো কাঠামোর কারণে দেখতে বড় কোনো পোকামাকড়ের মতো। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।

দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে অবস্থান করায় ভ্লাসেনকোর ওজন কমে আনুমানিক ৭০ কেজিতে নেমে এসেছিল বলে ধারণা করেছিলেন উদ্ধার অভিযানের কর্মকর্তারা। সে হিসাবে তাঁকে ড্রোনে ঝুলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

তবে পুরো অভিযান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বড় আকারের ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রায়ই রাশিয়ার ছোট এফপিভি ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এসব ড্রোনের সাহায্যে চালকেরা দূর থেকে সরাসরি দৃশ্য দেখে লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করতে পারেন।

অক্টোবরের শুরুর দিকে ভ্লাসেনকোর কাছে নিয়মিত সরবরাহের প্যাকেটের সঙ্গে একটি বিশেষ নিরাপত্তা বেল্ট বা হারনেস এবং নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন পাঠানো হয়। এতে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁকে উদ্ধারের প্রস্তুতি চলছে।

ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও তাঁর সামনে অন্য কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর সেখানে পৌঁছায় ছয় প্রপেলারের ভারী ড্রোনটি। ভ্লাসেনকো একটি ক্যারাবিনারের সাহায্যে ড্রোনের উইঞ্চে ঝোলানো হারনেসের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এরপর ড্রোনটি তাঁকে মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট ওপরে তুলে নেয়।

মূল ড্রোনটির সঙ্গে অভিযানে আরও তিনটি ছোট ছয় প্রপেলারের ড্রোন ছিল। এগুলোর কাজ ছিল রুশ আক্রমণকারী ড্রোনগুলোকে বিভ্রান্ত করা, যাতে উদ্ধারকারী ড্রোনটি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।

এ ছাড়া রুশ ড্রোনের পরিচিত অবস্থানগুলোতে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানো হয়। এতে অংশ নেয় ইউক্রেনের চারটি এফপিভি ড্রোন দল, কামান এবং বড় স্থির-পাখার ড্রোন। উদ্ধার অভিযানের পথ নিরাপদ রাখতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

সব বাধা পেরিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ান শেষে ভ্লাসেনকোকে বহনকারী ড্রোনটি নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে উদ্ধারস্থলের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী।

মৃত্যুর অপেক্ষা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে

দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছেড়ে দেওয়া ভ্লাসেনকোর কাছে উদ্ধার অভিযানটি ছিল জীবনের এক বড় পরিবর্তন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অবস্থায় যে সেনা নিজেকে মৃত ভেবে নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত ড্রোনের সাহায্যে তাঁকে নিরাপদ স্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।

তবে আকাশপথে ড্রোনে ঝুলে যাওয়ার সময়ও ভয় ছিল তাঁর সঙ্গী। এত বিপদের মধ্যেও তাঁর সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম না যে কোথাও বনের মধ্যে পড়ে যাব। কিন্তু পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল, কারণ আমি সাঁতার জানি না।’

রয়টার্স জানিয়েছে, ভ্লাসেনকোর অভিজ্ঞতার বিবরণ ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তথ্য এবং উদ্ধারকারী ড্রোনে থাকা ক্যামেরার ভিডিওর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তাঁর বর্ণনার সব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমটি।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

দুই পা হারিয়ে গর্তে ৮ মাস, ড্রোনে উদ্ধার ইউক্রেনীয় সেনা

আপডেট সময় ০৩:৩৫:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

 

ড্রোন হামলায় দুই পা হারানোর পর ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্কুলের বয়লারঘরের নিচে ছোট্ট গর্তে আট মাসেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। চারপাশে রুশ ড্রোনের নজরদারি থাকায় তাঁকে উদ্ধার করতে বারবার ব্যর্থ হন সহযোদ্ধারা। শেষ পর্যন্ত গত ৪ অক্টোবর একটি ভারী মালবাহী ড্রোনের সাহায্যে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে ঝুলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কোনো সেনাকে ড্রোনের সাহায্যে এভাবে আকাশপথে উদ্ধারের প্রথম ঘটনা এটি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ভ্লাসেনকো। তখন তাঁর দুই পায়ের কাটা অংশ ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছিল।

আরও পড়ুন  রুশ ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের সুমিতে শিশু-নারীসহ নিহত ৩

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। জানতাম, আর কোনো আশা নেই।’

ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য ভ্লাসেনকো গত বছরের মে মাসে খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারির একটি অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ‘বাসকি’ সাংকেতিক নামে পরিচিত আরেক সেনাসদস্য।

দুই সেনাকে একটি ছোট মাটির বাংকারে থাকতে হতো। প্রতিদিন ড্রোনের মাধ্যমে তাঁদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল।

তবে ওই অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ভ্লাসেনকোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিতে যাওয়া দুই সেনা নিহত হন। পরে তাঁদের মরদেহ উদ্ধারে গিয়ে আরও দুই সেনা প্রাণ হারান।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’

প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাঁদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা কাছের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।

একপর্যায়ে শুকনো কাপড় ও খাবারের একটি প্যাকেট সংগ্রহ করতে বাইরে বের হন তাঁরা। এ সময় রাশিয়ার একটি নজরদারি ড্রোন তাঁদের শনাক্ত করে। পরে আরেকটি রুশ ড্রোন হামলা চালালে নিহত হন বাসকি। দিনটি ছিল তাঁর ৫০তম জন্মদিন।

ওই হামলায় ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের পাতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণের পর পড়ে গিয়ে ডান পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি। চলাফেরার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলায় স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে থাকা ছোট একটি গর্তে আশ্রয় নেন।

গর্তটির আয়তন ছিল প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার। সেখানে অবস্থান করেই বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাঁ পায়ের ক্ষত আরও খারাপ হতে থাকে। ডান পায়ের নিচের অংশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাড় বেরিয়ে আসে।

একপর্যায়ে বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের ছুরি দিয়ে ডান পায়ের পাতাটিও কেটে ফেলেন ভ্লাসেনকো। রক্তপাত বন্ধ করতে ব্যবহার করেন টুর্নিকেট।

তিনি বলেন, ‘আমাকে পায়ের পাতাটি কেটে ফেলতেই হয়েছিল। সেটি আমার পেছনে টেনে টেনে চলছিল। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’

ভ্লাসেনকোর ভাষায়, ‘তখন আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।’

আট মাসেরও বেশি সময় গর্তে

ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের নিচে ছোট্ট গর্তটিতে আট মাসেরও বেশি সময় আটকে ছিলেন ভ্লাসেনকো। সম্মুখসারিতে তাঁর মোট অবস্থানের সময় ছিল ৪৯১ দিন।

অঞ্চলটি সেনাদের কাছে ‘কিল জোন’ নামে পরিচিত। আকাশে অসংখ্য ড্রোন টহল দেওয়ায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আহত সেনাদের পিকআপ বা সাঁজোয়া যান দিয়ে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

ইউক্রেনীয় সেনারা মাটিতে চলাচলকারী চালকবিহীন যান ব্যবহার করেও ভ্লাসেনকোকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছানোর জন্য পাঠানো দুটি যানই রুশ ড্রোনের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।

উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ সাংকেতিক নামের এক কর্মকর্তা জানান, একপর্যায়ে তাঁদের মনে হচ্ছিল, ভ্লাসেনকোকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের নজরে আসে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি নতুন ভারী মালবাহী ড্রোন। সেটিকে ব্যবহার করেই সেনাটিকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়।

ছয় প্রপেলারের ড্রোনে উদ্ধার অভিযান

ড্রোনটিতে ছয়টি উল্লম্ব রোটর রয়েছে। কালো কাঠামোর কারণে দেখতে বড় কোনো পোকামাকড়ের মতো। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।

দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে অবস্থান করায় ভ্লাসেনকোর ওজন কমে আনুমানিক ৭০ কেজিতে নেমে এসেছিল বলে ধারণা করেছিলেন উদ্ধার অভিযানের কর্মকর্তারা। সে হিসাবে তাঁকে ড্রোনে ঝুলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

তবে পুরো অভিযান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বড় আকারের ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রায়ই রাশিয়ার ছোট এফপিভি ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এসব ড্রোনের সাহায্যে চালকেরা দূর থেকে সরাসরি দৃশ্য দেখে লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করতে পারেন।

অক্টোবরের শুরুর দিকে ভ্লাসেনকোর কাছে নিয়মিত সরবরাহের প্যাকেটের সঙ্গে একটি বিশেষ নিরাপত্তা বেল্ট বা হারনেস এবং নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন পাঠানো হয়। এতে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁকে উদ্ধারের প্রস্তুতি চলছে।

ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও তাঁর সামনে অন্য কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর সেখানে পৌঁছায় ছয় প্রপেলারের ভারী ড্রোনটি। ভ্লাসেনকো একটি ক্যারাবিনারের সাহায্যে ড্রোনের উইঞ্চে ঝোলানো হারনেসের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এরপর ড্রোনটি তাঁকে মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট ওপরে তুলে নেয়।

মূল ড্রোনটির সঙ্গে অভিযানে আরও তিনটি ছোট ছয় প্রপেলারের ড্রোন ছিল। এগুলোর কাজ ছিল রুশ আক্রমণকারী ড্রোনগুলোকে বিভ্রান্ত করা, যাতে উদ্ধারকারী ড্রোনটি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।

এ ছাড়া রুশ ড্রোনের পরিচিত অবস্থানগুলোতে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানো হয়। এতে অংশ নেয় ইউক্রেনের চারটি এফপিভি ড্রোন দল, কামান এবং বড় স্থির-পাখার ড্রোন। উদ্ধার অভিযানের পথ নিরাপদ রাখতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

সব বাধা পেরিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ান শেষে ভ্লাসেনকোকে বহনকারী ড্রোনটি নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে উদ্ধারস্থলের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী।

মৃত্যুর অপেক্ষা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে

দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছেড়ে দেওয়া ভ্লাসেনকোর কাছে উদ্ধার অভিযানটি ছিল জীবনের এক বড় পরিবর্তন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অবস্থায় যে সেনা নিজেকে মৃত ভেবে নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত ড্রোনের সাহায্যে তাঁকে নিরাপদ স্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।

তবে আকাশপথে ড্রোনে ঝুলে যাওয়ার সময়ও ভয় ছিল তাঁর সঙ্গী। এত বিপদের মধ্যেও তাঁর সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম না যে কোথাও বনের মধ্যে পড়ে যাব। কিন্তু পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল, কারণ আমি সাঁতার জানি না।’

রয়টার্স জানিয়েছে, ভ্লাসেনকোর অভিজ্ঞতার বিবরণ ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তথ্য এবং উদ্ধারকারী ড্রোনে থাকা ক্যামেরার ভিডিওর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তাঁর বর্ণনার সব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমটি।