মহাকাশে বিরল ‘বদহজম’: তারা গিলে এখনো ‘ঢেকুর’ তুলছে বিশালাকার ব্ল্যাক হোল
- আপডেট সময় ০৩:১৫:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 39
মহাবিশ্বের রহস্যময় দানব ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের শেষ নেই। তবে এবার এক ব্ল্যাক হোলের দেখা মিলেছে, যা কোনো একটি নক্ষত্র বা তারাকে গিলে খাওয়ার কয়েক বছর পর এখনো ‘ঢেকুর’ তুলছে। মহাজাগতিক এই বিরল ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের তীব্র ‘বদহজম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নিউ মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৬ কোটি ৫০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের একটি ছায়াপথে এই অদ্ভুতকাণ্ডের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সাধারণত ব্ল্যাক হোল কোনো বস্তুকে গিলে ফেলার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী এক মহাজাগতিক অস্থিরতা।
তারা গিলে ফেলার ২ বছর পর শুরু হয় ‘বমি’
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্ল্যাক হোলটি তার খুব কাছে চলে আসা একটি ‘লাল বামন’ প্রজাতির নক্ষত্রকে মহাকর্ষীয় বলের টানে ছিঁড়ে ফেলে। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রটি গ্যাসে পরিণত হয়। বিস্ময়কর বিষয় হলো, তারাটি ছিন্নভিন্ন হওয়ার প্রায় দুই বছর পর পর্যন্ত ব্ল্যাক হোলটি থেকে কোনো অবশিষ্টাংশ নির্গত হয়নি। কিন্তু গত ছয় বছর ধরে হঠাৎ করেই সেখান থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মহাজাগতিক বস্তুর স্রোত বা ‘জেট’ বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি অনেকটা খামখেয়ালি শিশুর মতো আচরণ—যে খাবার চিবিয়ে গিলতে না পেরে দীর্ঘ সময় পর হঠাৎ সজোরে মুখ থেকে বের করে দেয়। মহাকাশ বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ বা টিডিই।
বাড়ছে উজ্জ্বলতা, বিস্মিত বিজ্ঞানীরা
অরিগন ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিদ এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ইভেত্তে সেন্ডেস জানিয়েছেন, এই উৎস থেকে নির্গত আলোর তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে এটি প্রথম আবিষ্কারের সময়ের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “রেডিও তরঙ্গের ক্ষেত্রে এমন উজ্জ্বলতা সত্যিই অবিশ্বাস্য। বছরের পর বছর ধরে এটি চলছে এবং থামার কোনো লক্ষণ নেই।”
ব্ল্যাক হোলটি আয়তনে আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ৫০ লাখ গুণ ভারী। অন্যদিকে, যে দুর্ভাগা নক্ষত্রটি এর পেটে গেছে, সেটির ভর ছিল সূর্যের মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ।
কেন এই অস্বাভাবিক জেট?
ব্ল্যাক হোলের সীমানা বা ‘ইভেন্ট হরাইজন’-এর কাছে কোনো বস্তু চলে গেলে তা ‘স্প্যাগেটিফিকেশন’ প্রক্রিয়ায় লম্বা সুতার মতো প্রসারিত হয়ে যায়। অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিদ কেট আলেকজান্ডার জানান, নক্ষত্রটির কিছু অংশ ব্ল্যাক হোলে পড়ার সময় প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে সবটুকু গিলে ফেলার আগেই কিছু অংশ প্রবল বেগে ছিটকে বেরিয়ে আসে, যা টেলিস্কোপে রেডিও তরঙ্গ হিসেবে ধরা পড়ছে। গবেষকরা এখনো নিশ্চিত নন কেন এই নির্গত স্রোত বা ‘রিলেটিভিস্টিক জেট’ এতটা বিধ্বংসী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠল। ধারণা করা হচ্ছে, ব্ল্যাক হোলের চারপাশের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে এর কোনো গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই মহাজাগতিক আলোকচ্ছটা আগামী বছর নাগাদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর তীব্রতা পুরোপুরি স্তিমিত হতে আরও এক দশক বা তার বেশি সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন তারা। এই আবিষ্কারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ।


























