জাপানের সাধারণ নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির দল
- আপডেট সময় ১০:২৯:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 26
জাপানের সাধারণ নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দল ভূমিধস জয় পেয়েছে। এর ফলে দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের সংগৃহীত ফলাফল অনুযায়ী, গতকাল রোববার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৪৬৫ আসনের নিম্নকক্ষে তাকাইচির লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৩১৬টি আসনে জয়ী হয়েছে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৩৩টি আসনের চেয়ে অনেক বেশি। তবে এখনো নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হয়নি।
নিজ দলের জয়ের আভাস পাওয়ার পর সাংবাদিকদের তাকাইচি বলেন, ‘আমরা ক্রমাগত একটি দায়িত্বশীল ও সক্রিয় আর্থিক নীতির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছি। আমরা আর্থিক নীতির স্থায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেব এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করব।’
সানায়ে তাকাইচি ব্যক্তিগতভাবে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও গত সাত দশকের অধিকাংশ সময় জাপানের ক্ষমতায় থাকা এলডিপি সাম্প্রতিক সময়ে তহবিল জালিয়াতি ও ধর্মীয় কেলেঙ্কারির কারণে বেশ চাপে ছিল। দলের রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাস পরেই তিনি আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন।
রক্ষণশীল নেত্রী তাকাইচি করছাড় ও ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিছু ভোটারের সমর্থন অর্জন করেছেন। তবে সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা জাপানের ধীরগতির অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
গত ৩৬ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম জাপানে শীতকালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। টোকিওসহ বিভিন্ন শহরে গত কয়েক দিনের রেকর্ড তুষারপাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও ভোটারদের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। তুষারের কারণে অনেক এলাকায় ভোটকেন্দ্র আগে বন্ধ করে দিতে হলেও তাকাইচির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা মানুষকে কেন্দ্রে টেনে এনেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এই নেত্রী তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন।
এবার আগের নির্বাচনের তুলনায় অগ্রিম ভোট কম পড়েছে। এক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত প্রায় ৪৬ লাখ ভোটার অগ্রিম ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এটি ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ভারী তুষারপাতের কারণে এমনটা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তাকাইচির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এ নির্বাচনে এলডিপিকে তাদের অবস্থান শক্তপোক্ত করতে সহায়তা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় তাকাইচি এখন তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন—জাপানের ‘শান্তিবাদী সংবিধান’ সংশোধনের পথে হাঁটতে পারবেন। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাপানি সেনাবাহিনীর ওপর থাকা আইনি সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে তাঁর এই ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বেইজিংয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে তাঁর কঠোর অবস্থান নিয়ে চীন ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তাকাইচির এই ঐতিহাসিক বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলাফল ঘোষণার আগেই ট্রাম্প তাকাইচিকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়ে এক বিরল কূটনৈতিক সৌজন্য দেখিয়েছেন। এ ছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তাকাইচিকে জয়ের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
জাপানের হোসেই ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ক্রেগ মার্ক বলেন, এই ভূমিধস জয় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে বিরোধী দলগুলোকে কোণঠাসা করার ক্ষমতা দেবে। মূলত তিনি এখন তাঁর ইচ্ছামতো যেকোনো আইন পাস করিয়ে নিতে পারবেন, সেটা সম্প্রতি অনুমোদিত রেকর্ড বাজেট হোক কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যয়।
এদিকে জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ‘কেইডানরেন’-এর প্রধান ইয়োশিনোবু সুৎসুই এই নির্বাচনী ফলাফলকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের মাধ্যম হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, টেকসই ও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য জাপানের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।’
জাপানের এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর কড়া নজর রাখছে বেইজিং। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মাথায় সানায়ে তাকাইচি চীনের সঙ্গে এক বড় ধরনের বিবাদ উসকে দিয়েছিলেন। তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় টোকিও কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে গত এক দশকের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা তৈরি করেন তিনি।
নির্বাচনে ব্যাপক জনসমর্থন তাকাইচির সামরিক প্রতিরক্ষা জোরদার করার পরিকল্পনাকে আরও গতিশীল করতে পারে। তবে বেইজিং এটিকে জাপানের সেই পুরনো ‘যুদ্ধবাজ’ চরিত্রে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছে।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য এশিয়া গ্রুপের কর্মকর্তা ডেভিড বোলিং বলেন, ‘বেইজিং কোনোভাবেই তাকাইচির এই জয়কে স্বাগত জানাবে না। তাকাইচি নিজের অবস্থানে শক্তভাবে জেঁকে বসেছেন। তাঁকে পুরোপুরি জনবিচ্ছিন্ন করতে বেইজিংয়ের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।’























