ঢাকা ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন জবানবন্দিতে অপ্রতিম হত্যার নেপথ্য

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১১:৫৫:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 40

ছবি : সংগৃহীত

 

কুমিল্লার স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া এবং তার আইফোন নেওয়ার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে। তবে হত্যার পর কে কোথায় গিয়েছিল এবং ঘটনার পর কার ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে জবানবন্দিগুলোতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন  খুলনায় শ্রমিক দলের নেতাকে গুলি করে হত্যা, আটক ১

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও বানানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেত অপ্রতিম।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তুহিন।

ফাহাদের জবানবন্দিতেও ওই দিনের বৈঠকের কথা রয়েছে। তবে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় সে তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তুহিন।

অন্যদিকে সিয়ামের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে এক বন্ধু তাকে জানায়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ তিন জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, হত্যার সিদ্ধান্ত ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি।

হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের দেখা হয় বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। সেখান থেকে অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে ওই নম্বরে তাদের কথা হয় এবং পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ফাহাদকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ছবি তোলা। ছবি তোলার সূত্রে গড়ে ওঠা পরিচয় ও বন্ধুত্বই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে বলে তিন আসামির জবানবন্দি থেকে উঠে এসেছে।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়েছেন তুহিন। এরপর তাকে কৌশলে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তিনি। জায়গাটি নির্জন এবং সেটি তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তুহিন।

অন্যদিকে ফাহাদ জানিয়েছে, দুপুর দুইটার পর কোটবাড়ি বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল বলে তার বক্তব্য।

সিয়ামের জবানবন্দি অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ের দিকে যায়।

পাহাড়ে গিয়ে তারা অপ্রতিম ও তুহিনকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে। পরে চারজন কিছু সময় গল্প ও আড্ডা দেয়। এই অংশের বর্ণনাতেও তিন জবানবন্দিতে মিল রয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের আগে অপ্রতিমের আইফোন নেওয়ার বিষয়েও তিন আসামির বক্তব্যে মিল পাওয়া গেছে। ফাহাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নেওয়ার পর কিছুক্ষণ ব্যবহার করা হয়। পরে সেটি অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশের আগের বক্তব্যেও বলা হয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।

তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি অপ্রতিমকে থাপ্পড় দেন। পরে পাশে পড়ে থাকা একটি কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুজনকেও অপ্রতিমকে মারতে বলেন।

ফাহাদ জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে আঘাত করেন। সিয়ামের জবানবন্দিতেও তুহিনের প্রথম আঘাতের কথা উল্লেখ রয়েছে।

শুধু আইফোন নেওয়া নয়, সেটি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল বলে জবানবন্দিগুলোতে উঠে এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল।

ফাহাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, ফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সিয়ামও জানিয়েছে, আইফোন বিক্রি করে পাওয়া অর্থ থেকে তাকে ভাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে হত্যার পেছনে আইফোন নেওয়া এবং সেটি বিক্রি করে অর্থ ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যের কথা তিন জবানবন্দিতেই উঠে এসেছে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে আসামিদের চলে যাওয়ার বিষয়ে অবশ্য বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তুহিনের ভাষ্য, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।

ফাহাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সিয়ামও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান। তবে তিন আসামির বক্তব্যেই অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তার কাছে পুরো ঘটনা জানান। হত্যার পরিকল্পনার বিষয়েও সিয়াম আগে থেকেই জানতেন বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি। পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য ছিল, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছিল, হত্যার দিন রাতেই তুহিন সিয়ামের সঙ্গে দেখা করে তাকে ঘটনাটির বিস্তারিত জানান।

হত্যার পরদিন আসামিদের আচরণ নিয়েও জবানবন্দিতে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তুহিন জানিয়েছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত ফাহাদ জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

সিয়ামের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়।

এর মধ্যে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও মূল ঘটনাপ্রবাহের বেশ কিছু বিষয়ে মিল থাকলেও কিছু বিষয় এখনো তদন্তের আওতায় রয়েছে। হত্যার পরিকল্পনায় কার ভূমিকা কতটা ছিল, ঘটনাস্থলে প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল, আইফোনটি পরে কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

বিশেষ করে তুহিনের জবানবন্দিতে সিয়ামের নাম আসার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, অন্য দুই আসামির বক্তব্যে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।

২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

নিউজটি শেয়ার করুন

তিন জবানবন্দিতে অপ্রতিম হত্যার নেপথ্য

আপডেট সময় ১১:৫৫:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

কুমিল্লার স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া এবং তার আইফোন নেওয়ার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে। তবে হত্যার পর কে কোথায় গিয়েছিল এবং ঘটনার পর কার ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে জবানবন্দিগুলোতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন  মাদকের টাকা না পেয়ে মাকে হত্যা

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও বানানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেত অপ্রতিম।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তুহিন।

ফাহাদের জবানবন্দিতেও ওই দিনের বৈঠকের কথা রয়েছে। তবে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় সে তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তুহিন।

অন্যদিকে সিয়ামের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে এক বন্ধু তাকে জানায়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ তিন জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, হত্যার সিদ্ধান্ত ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি।

হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের দেখা হয় বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। সেখান থেকে অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে ওই নম্বরে তাদের কথা হয় এবং পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ফাহাদকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ছবি তোলা। ছবি তোলার সূত্রে গড়ে ওঠা পরিচয় ও বন্ধুত্বই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে বলে তিন আসামির জবানবন্দি থেকে উঠে এসেছে।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়েছেন তুহিন। এরপর তাকে কৌশলে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তিনি। জায়গাটি নির্জন এবং সেটি তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তুহিন।

অন্যদিকে ফাহাদ জানিয়েছে, দুপুর দুইটার পর কোটবাড়ি বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল বলে তার বক্তব্য।

সিয়ামের জবানবন্দি অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ের দিকে যায়।

পাহাড়ে গিয়ে তারা অপ্রতিম ও তুহিনকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে। পরে চারজন কিছু সময় গল্প ও আড্ডা দেয়। এই অংশের বর্ণনাতেও তিন জবানবন্দিতে মিল রয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের আগে অপ্রতিমের আইফোন নেওয়ার বিষয়েও তিন আসামির বক্তব্যে মিল পাওয়া গেছে। ফাহাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নেওয়ার পর কিছুক্ষণ ব্যবহার করা হয়। পরে সেটি অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশের আগের বক্তব্যেও বলা হয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।

তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি অপ্রতিমকে থাপ্পড় দেন। পরে পাশে পড়ে থাকা একটি কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুজনকেও অপ্রতিমকে মারতে বলেন।

ফাহাদ জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে আঘাত করেন। সিয়ামের জবানবন্দিতেও তুহিনের প্রথম আঘাতের কথা উল্লেখ রয়েছে।

শুধু আইফোন নেওয়া নয়, সেটি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল বলে জবানবন্দিগুলোতে উঠে এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল।

ফাহাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, ফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সিয়ামও জানিয়েছে, আইফোন বিক্রি করে পাওয়া অর্থ থেকে তাকে ভাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে হত্যার পেছনে আইফোন নেওয়া এবং সেটি বিক্রি করে অর্থ ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যের কথা তিন জবানবন্দিতেই উঠে এসেছে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে আসামিদের চলে যাওয়ার বিষয়ে অবশ্য বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তুহিনের ভাষ্য, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।

ফাহাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সিয়ামও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান। তবে তিন আসামির বক্তব্যেই অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তার কাছে পুরো ঘটনা জানান। হত্যার পরিকল্পনার বিষয়েও সিয়াম আগে থেকেই জানতেন বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি। পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য ছিল, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছিল, হত্যার দিন রাতেই তুহিন সিয়ামের সঙ্গে দেখা করে তাকে ঘটনাটির বিস্তারিত জানান।

হত্যার পরদিন আসামিদের আচরণ নিয়েও জবানবন্দিতে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তুহিন জানিয়েছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত ফাহাদ জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

সিয়ামের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়।

এর মধ্যে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও মূল ঘটনাপ্রবাহের বেশ কিছু বিষয়ে মিল থাকলেও কিছু বিষয় এখনো তদন্তের আওতায় রয়েছে। হত্যার পরিকল্পনায় কার ভূমিকা কতটা ছিল, ঘটনাস্থলে প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল, আইফোনটি পরে কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

বিশেষ করে তুহিনের জবানবন্দিতে সিয়ামের নাম আসার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, অন্য দুই আসামির বক্তব্যে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।

২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।