শবে বরাত: ফযীলত, বাস্তবতা ও করণীয়
- আপডেট সময় ০২:৪২:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
- / 72
মুসলিম সমাজে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো শবে বরাত। এ রাতটি কি শরীয়তসম্মতভাবে ফযীলতপূর্ণ, নাকি বিদআত? কেউ একে সুন্নত মনে করেন, কেউ আবার সম্পূর্ণ বিদআত বলে আখ্যায়িত করেন। মূলত কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই এই বিতর্ক আবর্তিত হয়—
১) শবে বরাত কি ‘ভাগ্য রজনী’, না ‘মুক্তির রজনী’?
২) শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে কোনো সহীহ হাদিস আছে কি না?
৩) এ রাতে ইবাদত না করে ঘুমিয়ে থাকলেও কি মাগফিরাত পাওয়া যাবে?
৪) শবে বরাত বিষয়ে সালাফ ও ইমামগণের অবস্থান কী?
৫) শবে বরাতকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিশেষ নামাজ ও আনুষ্ঠানিকতার শরয়ী হুকুম কী?
এই প্রবন্ধে উপরোক্ত বিষয়গুলো কুরআন, সহীহ হাদিস ও সালাফে সালেহীনের বক্তব্যের আলোকে পর্যালোচনা করা হবে—ইনশাআল্লাহ।
১. শবে বরাতের নামকরণ: ভাগ্য রজনী না মুক্তির রজনী?
ভারতীয় উপমহাদেশে ‘শবে বরাত’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। ‘শব’ ও ‘বরাত’—উভয়ই ফার্সি শব্দ।
শব = রাত
বরাত = মুক্তি, অব্যাহতি, ফরমান
এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ফার্সি ভাষার প্রভাব থাকায় নামাজ, রোজা, শবে কদর—এ ধরনের পরিভাষা প্রচলিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের ধারণা অনুযায়ী, এ রাতে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়—এই বিশ্বাস থেকেই অনেকে একে ‘ভাগ্য রজনী’ বলে থাকেন। (ফিরুযুল লুগাত, পৃ. ১৬৫, ৬৩৯)
কিন্তু উপমহাদেশের বহু মুহাক্কিক আলেম শাবানের মধ্যরজনীকে ‘লায়লাতুল বারাআত’ (ليلة البراءة) অর্থাৎ মুক্তির রজনী নামে অভিহিত করেছেন। কারণ, একাধিক হাদিসে এ রাতে ব্যাপক মাগফিরাত ও গুনাহ থেকে মুক্তির ঘোষণা এসেছে।
‘মুক্তির রজনী’ নামটি কি নতুন?
না। বহু প্রাচীন আলেমের কিতাবে এই পরিভাষার ব্যবহার পাওয়া যায়—
আল্লামা তাহের পাটনী (৯৮৬ হি.)
وقال ابن دحية : أحاديث صلاة البراءة موضوعة
(তাযকিরাতুল মাউযুআত, পৃ. ৪৫–৪৬)
মোল্লা আলী ক্বারী (১০১৪ হি.)
وقال علي القاري في رسالة له ألفها في ليلة القدر وليلة البراءة
(আল-আসারুল মারফূ‘আ, পৃ. ১৫৫)
আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (১৩৫২ হি.)
وصح الروايات في فضل ليلة البراءة
(আল-‘আরফুশ শাযী, ১/১৫২)
অতএব, ‘শবে বারাআত’ বা ‘মুক্তির রজনী’ নামটি নতুন কোনো উদ্ভাবন নয়।
২. শবে বরাত কি ‘ভাগ্য রজনী’?
অনেকে সূরা দুখানের আয়াত পেশ করে বলেন, এ রাতেই ভাগ্য নির্ধারিত হয়—
﴿فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ﴾
“এ রাতেই প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।” (সূরা দুখান: ৪)
কিন্তু ইবনে কাসীর (রহ.), **ইবনে রজব (রহ.)**সহ অধিকাংশ মুফাসসির স্পষ্টভাবে বলেন—
এই আয়াতে যে ‘বরকতময় রাত’-এর কথা বলা হয়েছে, তা হলো লায়লাতুল কদর, যা রমযান মাসে অবস্থিত।
ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন—
“যে ব্যক্তি বলে, এটি শাবানের মধ্যরজনী—সে অনেক দূরের কথা বলেছে।”
(তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/৪৬০)
ইবনে রজব (রহ.) বলেন—
“জুমহুর আলেমের মতে, এটি লাইলাতুল কদর—এটাই সহীহ।”
(লাতাইফুল মা‘আরিফ, পৃ. ১৯৪)
সিদ্ধান্ত
👉 শবে বরাতকে ‘ভাগ্য রজনী’ বলা কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
৩. শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে সহীহ হাদিস
(ক) মুআয ইবনে জাবাল (রাযি.)–এর হাদিস
يَطْلُعُ اللَّهُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ…
“আল্লাহ তাআলা শাবানের মধ্যরাতে তাঁর সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”
(সহীহ ইবনে হিব্বান ৫৬৬৫)
এই হাদিসকে ইবনে হিব্বান, বাইহাকী, হায়সামী, মুনযিরী, আলবানী (রহ.) সহীহ বলেছেন।
শায়খ আলবানী (রহ.) বলেন—
“বিভিন্ন সনদের সমষ্টিতে এ হাদিস নিঃসন্দেহে সহীহ।”
(সিলসিলা সহীহাহ ৩/১৩৫)
৪. শবে বরাতের আমল: কী সাব্যস্ত হয়?
হাদিসসমূহ থেকে যে বিষয়গুলো প্রমাণিত—
✅ প্রমাণিত আমল
শিরক থেকে বেঁচে থাকা
বিদ্বেষ ও হিংসা পরিত্যাগ করা
একাকী নফল ইবাদত, দুআ ও ইস্তিগফার
অন্তর পরিশুদ্ধ করা
❌ প্রমাণিত নয়
নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামাজ (সালাতে আলফিয়া)
আতশবাজি, প্রদীপ জ্বালানো
নির্দিষ্ট দিবসে রোজাকে ফরজ বা সুন্নত মনে করা
৫. ইমামগণের মতামত (সংক্ষেপ)
ইবনে তাইমিয়া (রহ.):
এ রাতের ফযীলত আছে, তবে বিশেষ নামাজ ও আনুষ্ঠানিকতা বিদআত।
(ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম ২/৬৩১)
ইবনে রজব হাম্বলী (রহ.):
একাকী ইবাদত উত্তম, বিদ্বেষ পরিত্যাগ অপরিহার্য।
(লাতাইফুল মা‘আরিফ)
আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ.):
শবে বরাতের ফযীলত সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
(আল-‘আরফুশ শাযী)
উপসংহার
✔ শবে বরাত একটি ফযীলতপূর্ণ রাত
✔ এটি ভাগ্য রজনী নয়, বরং মুক্তির রজনী
✔ শিরক ও বিদ্বেষ মুক্ত অন্তরই এ রাতের মূল দাবি
✔ বিদআত পরিহার করে সুন্নাহসম্মত ইবাদতেই বরকত
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হককে হক হিসেবে গ্রহণ করার এবং বাতিল থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।


























