ঢাকা ০৯:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম :
প্রবাসী কার্ডে মিলবে বিমান টিকিট, লাউঞ্জ ও ভূমি সেবায় বিশেষ সুবিধা ‎হোয়াটসঅ্যাপে আসছে ‘লিকুইড গ্লাস’ ডিজাইন, বদলাচ্ছে ব্যবহার অভিজ্ঞতা ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত বাংলাদেশের এক বছরে বিচারাধীন মামলা ২০ লাখে নামানো সম্ভব: আইনমন্ত্রী জামিন পেলেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী দিল্লিতে বিক্ষোভে সংঘর্ষ, ১১৮ পুলিশ সদস্য আহত; ৭০ ককরোচ গ্রেপ্তার সাইবার বুলিং দমনে আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করবে সরকার ‎সৌদিকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সবুজ সংকেত ট্রাম্প প্রশাসনের ‎ মিত্র দলগুলোর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা, ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

৫জি প্রকল্পে ১৬৫ কোটির স্থলে ৩২৬ কোটি টাকার ব্যয়, তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:০৪:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫
  • / 502

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে ৫জি সুবিধা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ‘বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৬ কোটি টাকা, যেখানে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৬৫ কোটি টাকার মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব ছিল বলে জানিয়েছে বুয়েটের একটি সমীক্ষা।

বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ ব্যান্ডউইথ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ২৬.২ টেরাবাইট। এই চাহিদা মেটাতে ১০০জি ক্ষমতাসম্পন্ন লাইন কার্ড প্রযুক্তিই যথেষ্ট হতো। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী গোষ্ঠী ১২৬ টেরাবাইট ক্ষমতার যন্ত্রপাতি কিনতে চাচ্ছে, যার ফলে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩২৬ কোটি টাকায়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে কার্যাদেশ প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে দুদকের আপত্তি সত্ত্বেও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব নিজস্ব প্যাডে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি চালিয়ে যেতে চাপ প্রয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন  সারাদেশে টেলিযোগাযোগ সেবা বিঘ্নিত, ৫ হাজারের বেশি সাইট বন্ধ

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রকল্পের অনিয়ম তদন্তে নেমে অতিরিক্ত সক্ষমতার অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়, গোপনীয়তার শর্ত লঙ্ঘন এবং সরকারি ক্রয় নীতিমালার ব্যত্যয়ের প্রমাণ পেয়েছে। দুদক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রকল্পের বাকি কার্যক্রম চালানো হলে তা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং আইন লঙ্ঘন হবে। এক চিঠিতে তারা উল্লেখ করে, “এ প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ার অবশিষ্ট কার্যক্রম এগিয়ে নিলে তা আইনের ব্যত্যয় হবে।”

তবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দাবি করেছেন, বর্তমানে দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৩৫ টেরাবাইট ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৫০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে ১২৬ টেরাবাইট ক্ষমতার যন্ত্রপাতি যৌক্তিক। এ ছাড়া ২৯০ কোটি টাকার এলসি ইতোমধ্যে খোলা হয়েছে, প্রকল্প বাতিল হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হবে বলেও যুক্তি দিয়েছেন তিনি।

দুদকের কর্মকর্তারা এই ধরনের চিঠিকে স্বাধীন তদন্তে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সাবেক দুদক মহাপরিচালক মইদুল ইসলাম বলেছেন, “দুদক তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী কাজ করে, কেউ তাকে নির্দেশনা দিতে পারে না।”

প্রকল্প ঘিরে মন্ত্রী, সচিব ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বন্দ্বও দেখা দিয়েছে। তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান তাদের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে। বিটিসিএলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসাদুজ্জামান চৌধুরী দরপত্র বাতিল করলে তাকে বরখাস্ত ও মামলায় হয়রানি করা হয়, যা পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়।

কার্যাদেশ পাওয়া হুয়াওয়ের প্রতিনিধি তানভীর আহমেদ বলেছেন, তারা নিয়ম মেনেই কাজ পেয়েছেন এবং দুদকের আচরণে বিস্মিত হয়েছেন। যদিও পরে স্বীকার করেছেন, দুদকের বক্তব্য মন্ত্রণালয়ের আগের চিঠির জবাবে ছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “যেকোনো বড় বিনিয়োগের আগে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দিয়ে ঝুঁকি ও ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণ করা জরুরি। হুয়াওয়ের যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, তেমনি বিতর্কিত ইতিহাসও রয়েছে। তদন্তাধীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চিঠি দেওয়া সরাসরি তদন্তে হস্তক্ষেপ এবং অনৈতিক।”

 

নিউজটি শেয়ার করুন

৫জি প্রকল্পে ১৬৫ কোটির স্থলে ৩২৬ কোটি টাকার ব্যয়, তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ

আপডেট সময় ১২:০৪:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫

বাংলাদেশে ৫জি সুবিধা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ‘বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৬ কোটি টাকা, যেখানে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৬৫ কোটি টাকার মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব ছিল বলে জানিয়েছে বুয়েটের একটি সমীক্ষা।

বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ ব্যান্ডউইথ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ২৬.২ টেরাবাইট। এই চাহিদা মেটাতে ১০০জি ক্ষমতাসম্পন্ন লাইন কার্ড প্রযুক্তিই যথেষ্ট হতো। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী গোষ্ঠী ১২৬ টেরাবাইট ক্ষমতার যন্ত্রপাতি কিনতে চাচ্ছে, যার ফলে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩২৬ কোটি টাকায়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে কার্যাদেশ প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে দুদকের আপত্তি সত্ত্বেও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব নিজস্ব প্যাডে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি চালিয়ে যেতে চাপ প্রয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন  সারা দেশের ৪০০টিরও বেশি স্থানে চালু হলো ফাইভ-জি

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রকল্পের অনিয়ম তদন্তে নেমে অতিরিক্ত সক্ষমতার অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়, গোপনীয়তার শর্ত লঙ্ঘন এবং সরকারি ক্রয় নীতিমালার ব্যত্যয়ের প্রমাণ পেয়েছে। দুদক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রকল্পের বাকি কার্যক্রম চালানো হলে তা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং আইন লঙ্ঘন হবে। এক চিঠিতে তারা উল্লেখ করে, “এ প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ার অবশিষ্ট কার্যক্রম এগিয়ে নিলে তা আইনের ব্যত্যয় হবে।”

তবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দাবি করেছেন, বর্তমানে দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৩৫ টেরাবাইট ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৫০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে ১২৬ টেরাবাইট ক্ষমতার যন্ত্রপাতি যৌক্তিক। এ ছাড়া ২৯০ কোটি টাকার এলসি ইতোমধ্যে খোলা হয়েছে, প্রকল্প বাতিল হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হবে বলেও যুক্তি দিয়েছেন তিনি।

দুদকের কর্মকর্তারা এই ধরনের চিঠিকে স্বাধীন তদন্তে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সাবেক দুদক মহাপরিচালক মইদুল ইসলাম বলেছেন, “দুদক তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী কাজ করে, কেউ তাকে নির্দেশনা দিতে পারে না।”

প্রকল্প ঘিরে মন্ত্রী, সচিব ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বন্দ্বও দেখা দিয়েছে। তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান তাদের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে। বিটিসিএলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসাদুজ্জামান চৌধুরী দরপত্র বাতিল করলে তাকে বরখাস্ত ও মামলায় হয়রানি করা হয়, যা পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়।

কার্যাদেশ পাওয়া হুয়াওয়ের প্রতিনিধি তানভীর আহমেদ বলেছেন, তারা নিয়ম মেনেই কাজ পেয়েছেন এবং দুদকের আচরণে বিস্মিত হয়েছেন। যদিও পরে স্বীকার করেছেন, দুদকের বক্তব্য মন্ত্রণালয়ের আগের চিঠির জবাবে ছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “যেকোনো বড় বিনিয়োগের আগে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দিয়ে ঝুঁকি ও ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণ করা জরুরি। হুয়াওয়ের যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, তেমনি বিতর্কিত ইতিহাসও রয়েছে। তদন্তাধীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চিঠি দেওয়া সরাসরি তদন্তে হস্তক্ষেপ এবং অনৈতিক।”