ঈদের খাবার: মোগল দরবার থেকে বাঙালির ঘরে
- আপডেট সময় ০৭:০৭:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
- / 0
ঈদ মানেই আনন্দ, নামাজ, দান-খয়রাত—আর তার সঙ্গে জমজমাট ভোজ। আজকের বাঙালির ঈদের টেবিলে যে সেমাই, কোরমা, বিরিয়ানি বা কাবাব দেখা যায়, তার শিকড় অনেকটাই প্রাচীন মোগল আমলে।
মোগল দরবারের হেঁশেল থেকে শুরু
মোগল সাম্রাজ্য শুধু রাজনৈতিক শক্তিই ছিল না, ছিল এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র। তুর্কি, পারস্য, মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি হয়েছিল এক নতুন রন্ধনধারা।
সম্রাট আকবর-এর আমলে এই মিশ্রণ সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর দরবারে বিদেশি বাবুর্চিরা স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নতুন নতুন পদ তৈরি করতেন—যার অনেকটাই আজও টিকে আছে ঈদের খাবারে।
মোগলদের রান্নাঘর ‘মাতবাখ’ ছিল বিশাল আয়োজনের কেন্দ্র। শত শত বাবুর্চি বিভিন্ন বিভাগে ভাগ হয়ে রান্না করতেন। ঈদের মতো উৎসব সামনে রেখে কয়েকদিন আগ থেকেই প্রস্তুতি চলত।
ঈদের সকাল: সেমাই ও মিষ্টান্ন
ঈদুল ফিতরের শুরুটা হতো দুধ ও সেমাই দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন দিয়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ‘শির খুরমা’।
এই খাবারটি মূলত পারস্য ও মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্য থেকে এসেছে। দুধ, খেজুর, বাদাম, পেস্তা আর সেমাই দিয়ে তৈরি এই মিষ্টান্নই আজকের সেমাইয়ের পূর্বসূরি।
এছাড়া ফিরনি ও ক্ষীরও ছিল জনপ্রিয়। জাফরান, গোলাপজল ও শুকনো ফলের ব্যবহার এসব খাবারকে দিত আলাদা সুগন্ধ ও স্বাদ।
ভোজের মূল আকর্ষণ: বিরিয়ানি, পোলাও
মোগলদের ঈদের ভোজে চালের পদ ছিল অপরিহার্য। পারস্য প্রভাবিত পোলাও পরে ভারতীয় মসলা মিশে হয়ে ওঠে আরও সমৃদ্ধ।
সম্রাট শাহজাহান-এর সময়ে জাফরান ও শুকনো ফলে সমৃদ্ধ পোলাও বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। এখান থেকেই পরবর্তীতে বিরিয়ানির বিভিন্ন আঞ্চলিক ধরন তৈরি হয়।
‘মুতাঞ্জন’ নামে মিষ্টি পোলাওও ছিল উৎসবের আকর্ষণ—যেখানে চালের সঙ্গে চিনি, শুকনো ফল এমনকি মাংসও ব্যবহার করা হতো।
মাংসের পদ: কাবাব থেকে কোরমা
মোগল যুগেই কাবাবের বিস্তার ঘটে। মধ্য এশীয় প্রভাব থেকে আসা এই খাবার রাজকীয় রান্নায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
সম্রাট জাহাঙ্গীর-এর সময়কার বর্ণনায় কাবাব ও মাংসের নানা পদের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ঈদের খাবারে তখন থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে—
* কোরমা
* শিক ও বটি কাবাব
* নিহারি
* রোস্ট মাংস
আজও এসব পদ ঈদের টেবিলের প্রধান আকর্ষণ।
রুটি, শরবত ও সুগন্ধি খাবার
নান, রুমালি রুটি, তন্দুরি রুটি—এসব ছিল মাংসের পদের সঙ্গী। পাশাপাশি দুধ, ঘি ও জাফরান দিয়ে তৈরি ‘শিরমাল’ নামের মিষ্টি রুটিও ছিল জনপ্রিয়।
ভোজে থাকত ফল ও শরবত—ডালিম, আঙুর, গোলাপ বা কেওড়া দিয়ে তৈরি সুগন্ধি পানীয়।
মোগল রান্নার বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সুগন্ধি উপাদান—জাফরান, এলাচ, দারুচিনি, গোলাপজল—যা আজও ঈদের রান্নায় ব্যবহার হয়।
রাজকীয় ভোজ থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে
শুরুতে এসব খাবার ছিল রাজদরবার ও অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পরে বাবুর্চিরা শহরে দোকান খুললে, বিয়ে-উৎসবে এসব রান্না ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেসিপি সহজ হয়েছে, উপকরণ বদলেছে—কিন্তু মূল স্বাদ ও ঐতিহ্য থেকে গেছে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
আজকের বাঙালির ঈদের টেবিলে যে সেমাই, বিরিয়ানি, কোরমা বা কাবাব দেখা যায়—তা আসলে কয়েকশ বছর আগের মোগল দরবারেরই উত্তরাধিকার।
রাজকীয় জাঁকজমক হয়তো কমেছে, কিন্তু স্বাদ আর ঐতিহ্য এখনও একইভাবে টিকে আছে—এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।
তথ্যসূত্র:
আইনী-ই-আকবরী — আবুল ফজল
তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী — সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্মৃতিকথা
The Emperor’s Table: The Art of Mughal Cuisine — সালমা হোসেন
Indian Food: A Historical Companion — কে.টি. আছায়া
Curry: A Tale of Cooks and Conquerors — লিজি কলিংহ্যাম



















