ঢাকা ০১:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে ভারত মহাসাগরে জাহাজডুবি, বহু নাবিক নিখোঁজ কুর্দিদের অতিদ্রুত পক্ষ নির্বাচন করতে বলেছেন ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে চীন-জাপান খালেদা জিয়াসহ ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে ২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সাংবাদিক আনিস আলমগীরের জামিন কলম্বিয়া: আন্দেস, আমাজন ও ক্যারিবিয়ানের মিলনভূমি ইরানি হামলায় আহত দুই প্রবাসীকে দেখতে হাসপাতালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইরানের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সাহায্যের প্রস্তাব ইউক্রেনের আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ৯ এপ্রিল: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ঘোষণা পহেলা বৈশাখে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

ভাতার টাকা গায়েব: ‘নগদ’-এর বিরুদ্ধে ১,৭১১ কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:৪১:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ জুন ২০২৫
  • / 171

ছবি সংগৃহীত

 

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত ১,৭১১ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক তদন্তে উঠে এসেছে, ৪১টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে এই বিপুল অঙ্কের সরকারি ভাতা তুলে নিয়েছে নগদের একটি সিন্ডিকেট, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন, প্রতারণা ও অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভাতা আত্মসাৎ, ই-কমার্স গ্রাহকদের ১৪৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ, অনুমোদনহীন ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি তৈরি এবং প্রায় ৫০০ কোটি টাকার অর্থ বিদেশে পাচার।

আরও পড়ুন  শমী কায়সারের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের জন্য সরকারি অর্থ নগদের মাধ্যমে বিতরণ হতো। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত বলছে, ১,৭১১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা কোনোদিনই সেই ভুক্তভোগীদের হাতে পৌঁছায়নি। এসব অর্থ নগদের একাউন্ট ঘুরে হাওয়া হয়ে গেছে।

এই আত্মসাতে সহায়তা করেছে নগদের সঙ্গে যুক্ত ৪১টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটর। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এটি কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, বরং একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লুটপাট।

তদন্তে আরও উঠে আসে, নগদ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি সৃষ্টি করেছে, যা দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের একক অধিকার লঙ্ঘন করেছে।

২০২১ সালে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার গ্রাহক পণ্য অর্ডার দিয়ে নগদের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করলেও পণ্য পাননি। নগদ তখন একতরফাভাবে বহু গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় এবং প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগ উঠে।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, ক্যান্ডেলস্টোন ইনভেস্টমেন্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠান নগদে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও এক মাসের মাথায় সেই শেয়ার কম মূল্যে (২৩৬ কোটি টাকায়) সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একইভাবে, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে রেজিস্ট্রার্ড ‘মিরেস হোল্ডিংস লিমিটেড’-এর নামে ৭০ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তর করে বিদেশে অর্থ পাচারের চেষ্টা করা হয়।

নগদ একটি ভুয়া তথ্য পোর্টালও তৈরি করেছিল, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডাক বিভাগকে ভুল বুঝিয়ে প্রকৃত ই-মানি ও লেনদেনের তথ্য গোপন রাখা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “গ্রাহকদের স্বার্থে আমরা প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলাম, কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় তা কার্যকর হয়নি।”

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী শুধুমাত্র তফসিলভুক্ত ব্যাংকগুলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু নগদ ২০১৯ সালে ডাক বিভাগের নামে চালু হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন ছাড়াই। এখন পর্যন্ত তারা কোনো বৈধ চুক্তিপত্র বা পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স পায়নি, শুধু অন্তর্বর্তীকালীন অনুমোদনের ভিত্তিতে চলছে।

বর্তমানে নগদের গ্রাহক সংখ্যা ৯.৫ কোটির বেশি, এবং প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। দেশের এমএফএস লেনদেনে তাদের অংশ ১৮.৬৪ শতাংশ, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতি, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অভিযোগে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ভাতাভোগীরা ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত। এখন নজর রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের দিকে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ভাতার টাকা গায়েব: ‘নগদ’-এর বিরুদ্ধে ১,৭১১ কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ

আপডেট সময় ১২:৪১:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ জুন ২০২৫

 

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত ১,৭১১ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক তদন্তে উঠে এসেছে, ৪১টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে এই বিপুল অঙ্কের সরকারি ভাতা তুলে নিয়েছে নগদের একটি সিন্ডিকেট, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন, প্রতারণা ও অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভাতা আত্মসাৎ, ই-কমার্স গ্রাহকদের ১৪৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ, অনুমোদনহীন ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি তৈরি এবং প্রায় ৫০০ কোটি টাকার অর্থ বিদেশে পাচার।

আরও পড়ুন  শমী কায়সারের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের জন্য সরকারি অর্থ নগদের মাধ্যমে বিতরণ হতো। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত বলছে, ১,৭১১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা কোনোদিনই সেই ভুক্তভোগীদের হাতে পৌঁছায়নি। এসব অর্থ নগদের একাউন্ট ঘুরে হাওয়া হয়ে গেছে।

এই আত্মসাতে সহায়তা করেছে নগদের সঙ্গে যুক্ত ৪১টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটর। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এটি কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, বরং একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লুটপাট।

তদন্তে আরও উঠে আসে, নগদ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি সৃষ্টি করেছে, যা দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের একক অধিকার লঙ্ঘন করেছে।

২০২১ সালে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার গ্রাহক পণ্য অর্ডার দিয়ে নগদের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করলেও পণ্য পাননি। নগদ তখন একতরফাভাবে বহু গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় এবং প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগ উঠে।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, ক্যান্ডেলস্টোন ইনভেস্টমেন্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠান নগদে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও এক মাসের মাথায় সেই শেয়ার কম মূল্যে (২৩৬ কোটি টাকায়) সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একইভাবে, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে রেজিস্ট্রার্ড ‘মিরেস হোল্ডিংস লিমিটেড’-এর নামে ৭০ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তর করে বিদেশে অর্থ পাচারের চেষ্টা করা হয়।

নগদ একটি ভুয়া তথ্য পোর্টালও তৈরি করেছিল, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডাক বিভাগকে ভুল বুঝিয়ে প্রকৃত ই-মানি ও লেনদেনের তথ্য গোপন রাখা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “গ্রাহকদের স্বার্থে আমরা প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলাম, কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় তা কার্যকর হয়নি।”

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী শুধুমাত্র তফসিলভুক্ত ব্যাংকগুলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু নগদ ২০১৯ সালে ডাক বিভাগের নামে চালু হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন ছাড়াই। এখন পর্যন্ত তারা কোনো বৈধ চুক্তিপত্র বা পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স পায়নি, শুধু অন্তর্বর্তীকালীন অনুমোদনের ভিত্তিতে চলছে।

বর্তমানে নগদের গ্রাহক সংখ্যা ৯.৫ কোটির বেশি, এবং প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। দেশের এমএফএস লেনদেনে তাদের অংশ ১৮.৬৪ শতাংশ, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতি, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অভিযোগে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ভাতাভোগীরা ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত। এখন নজর রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের দিকে।