সৌদি-আমিরাতের সম্পর্কে নতুন সমীকরণ
- আপডেট সময় ০২:৪৮:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / 23
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কে আবারও ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর রিয়াদে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
দুই দেশের মধ্যে ইয়েমেন, ইরান, সুদান ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অতীতে মতপার্থক্য থাকলেও সাম্প্রতিক তৎপরতায় নতুন করে সহযোগিতার সম্ভাবনা সামনে এসেছে।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে থাকা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলে ছিলেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির মহাসচিব আলী আল শামসি, ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি, ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান আলী আল নেয়াদি এবং অন্য কর্মকর্তারা।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান জাতীয় দৈনিক দ্য ন্যাশনাল বৈঠকটিকে রিয়াদ ও আবুধাবির দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। উপসাগরীয় কূটনীতির অংশ হিসেবে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত সফর এবং অভিন্ন স্বার্থের বিষয়ে অবস্থান সমন্বয়ের ঘটনাও নতুন নয়।
তবে অতীতে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে সৌদি আরব ও আমিরাতের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইয়েমেন ইস্যু। দেশটির দীর্ঘস্থায়ী সংকট সৌদি আরবের জন্য বড় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আবদুর রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একসময় ইয়েমেনে একই পক্ষকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দুই দেশ ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায়। সৌদি আরব ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন অব্যাহত রাখলেও আমিরাত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ বা এসটিসিকে সহায়তা দিতে শুরু করে।
দক্ষিণ ইয়েমেনের হোদেইদাহ বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকা নিজেদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ মনে হওয়ার পর আমিরাত যুদ্ধ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। বিপরীতে সৌদি আরব হুথিদের হাত থেকে পুরো ইয়েমেনকে মুক্ত করার লক্ষ্য ধরে রাখে।
ইয়েমেনের পাশাপাশি সুদান, ইরান এবং অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়েও দুই দেশের নীতিগত পার্থক্য তৈরি হয়েছিল। ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ছিল ভিন্নতা। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি নেতৃত্বাধীন অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ বা ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ নেয় আমিরাত।
ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়েও দুই দেশের অবস্থান এক ছিল না। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রথম দেশ ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে সৌদি আরব তখন এমন পদক্ষেপ নেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে হুথি হুমকির প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের পরিবর্তে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকে রিয়াদের আগ্রহ দেখা গেছে।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরের পরদিনই সৌদি আরব সফর করেন আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনসুর বিন জায়েদ। আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার কথা বলা হলেও ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বৈঠকে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
ওই বৈঠকে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ইরান ও হুথিদের মতো অভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলাও রিয়াদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। অতীতে সৌদি আরবে ইরানের হামলার ঘটনাও ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথিদের হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব।
ইরানের চাপ শুধু সামরিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার মাধ্যমে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে হুথিরা সৌদি জাহাজের পাশাপাশি তেল পাইপলাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
প্রায় এক দশক আগে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছিল সৌদি আরব। ২০২২ সালে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয় রিয়াদ। তবে পুরোনো হুমকির পুনরাবির্ভাব সৌদি আরবের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চলতি বছরের শুরুতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে যৌথ স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে সমুদ্রপথের অপব্যবহার ঠেকাতে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করা হয়। তবে ওই উদ্যোগ হুথিদের হামলা ঠেকাতে সক্ষম হয়নি।
এরপর সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চুক্তিটিকে বড় ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে হুথিদের তৎপরতা ওই প্রতিরোধ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে।
পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চায় সৌদি আরব। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের বিষয়ে সম্মতি থাকলেও হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র নাকচ করে দেয়। পরে চীনের কাছেও সহযোগিতা চায় রিয়াদ। ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার অনুরোধ জানানো হয়।
এখন সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সংহতি ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে। গত বুধবার সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিলে দেওয়া ভাষণে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
তিনি বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে মিলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষা, কৌশলগত সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অখণ্ডতা ও যৌথ কার্যক্রম জোরদারে কাজ করছে সৌদি আরব। এর মাধ্যমে জিসিসির লক্ষ্য অর্জন এবং নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের কথাও বলেন তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অতীতে মুসলিম ব্রাদারহুড, আধুনিকায়ন, সিরিয়া, কাতার ও তুরস্কসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সৌদি আরব ও আমিরাতের নীতিতে মিল দেখা গেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ইসলামপন্থি অবস্থান নিয়ে আমিরাতের গভীর সংশয় থাকলেও সৌদি আরব ‘মক্কা চুক্তি’র মাধ্যমে আঙ্কারাকে নিজেদের বলয়ে আনার চেষ্টা করেছিল।
মোহাম্মদ বিন জায়েদকে একসময় মোহাম্মদ বিন সালমানের পরামর্শদাতা বা মেন্টর হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। এমনকি একপর্যায়ে সৌদি আরবও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল বলে আলোচনায় আসে।
সৌদি আরব ও আমিরাত এর আগেও সম্পর্ক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গত জুলাইয়ে সৌদি আরবের ন্যাশনাল মিডিয়া অথরিটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল্লাহ আল হামেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দুই দেশের সম্পর্ককে অভিন্ন ইতিহাস ও দুই ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের গভীর বন্ধনের সম্প্রসারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এরপর আগস্টে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ সৌদি বাদশাহ সালমানের কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের পানিবিষয়ক সম্মেলনে সৌদি বাদশাহকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরব ইয়েমেনে আবার সরাসরি হস্তক্ষেপ বা এ অঞ্চলে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার দিকে বেশি মনোযোগী। এর মাধ্যমে ইরানের মিত্র ও প্রক্সিগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হতে পারে।
১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নীতিমালা নির্ধারণের লক্ষ্য নিয়ে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের সময় জিসিসিভুক্ত দেশগুলো কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। বরং সংঘাতের প্রভাব তাদের নিজেদের ওপরও পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। একইভাবে হুথিদের কর্মকাণ্ড সৌদি নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগগুলোর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করেছে।
ফলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আবারও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলে অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার ক্ষেত্রে জিসিসির সম্মিলিত অবস্থান সৌদি আরব বা আমিরাতের একক অবস্থানের তুলনায় বেশি প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
একই সঙ্গে সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিয়েও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বা নজরদারির ক্ষেত্রে ইসরাইলের সহযোগিতা প্রয়োজন মনে করে, সে ক্ষেত্রে আমিরাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সফর ও যোগাযোগকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ও নতুন সমঝোতার একটি প্রক্রিয়া শুরুর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।























