বেগম খালেদা জিয়া: সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও দৃঢ়তার এক নারী পথিকৃত
- আপডেট সময় ১১:২০:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 106
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম — বেগম খালেদা জিয়া। গৃহবধূর শান্ত জীবন থেকে রাষ্ট্রনেতার মর্যাদায় উত্তরণ, সংগ্রাম, দৃঢ়তা এবং অটল নেতৃত্বের এক দীর্ঘ পথচলা তার জীবনের প্রতিচ্ছবি।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। শৈশব থেকেই তার মধ্যে গড়ে ওঠে সংযম, ধৈর্য এবং পারিবারিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি ব্যক্তিত্ব, যা পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক জীবনেও প্রভাব ফেলে।
জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডির ভূমিকায় আসেন।
১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার জীবনে আসে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা। সেই সময়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন হন। গৃহবধূ থেকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে উত্তরণ ছিল এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব:
খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী।
১৯৯১–১৯৯৬: প্রথমবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৯৬ সালে সংক্ষিপ্ত সময়: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং ক্ষমতা স্বচ্ছভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে হস্তান্তর করেন।
২০০১–২০০৬: দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে দেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন।
প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি শিক্ষা, অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা, মামলা ও বন্দীদশার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। তবে এসব চাপ ও প্রতিকূলতা তার অবস্থান নড়বড়ে করতে পারেনি। বরং তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক আপোষহীন প্রতীকে পরিণত হন।
২০২৪ সালের বর্ষা বিপ্লবের পর দীর্ঘ বন্দীদশা থেকে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। দেশে ফিরেই দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যগত জটিলতার সঙ্গে লড়াই শুরু হয়। বিদেশে উন্নত চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে তাকে সিসিইউতে নেওয়া হয়।
দুঃখজনকভাবে, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সকালে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
হাসপাতালের বাইরে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা গেছে। দেশে এবং বিদেশে অনেকে শোক প্রকাশ করেছেন। বিএনপি সাত দিনের শোক পালন ঘোষণা করেছে।
জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সংগ্রামকে সঙ্গী করেই এগিয়ে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। তবুও ছিলেন অবিচল, অদম্য ও দৃঢ়চেতা। গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক – তার প্রতিটি পদচারণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রেখে গেছে এক স্থায়ী ছাপ।
বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন নেত্রী নন – তিনি সংগ্রাম, দৃঢ়তা এবং প্রেরণার এক নারী পথিকৃত, যিনি দেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
























