ফ্রান্সে সহিংসতা-লুটপাট, গ্রেপ্তার ২ হাজার ৪০০
- আপডেট সময় ০১:৫৭:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- / 10
ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ থেকে সহিংসতা, সংঘর্ষ ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ার পর দেশবাসীকে শান্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জনসেবার মান কমে যাওয়ার প্রতিবাদে শনিবার প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবারের বিক্ষোভের পর রোববারও রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও অস্থিরতা অব্যাহত ছিল। এলিসি প্রাসাদ থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভকারীদের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত।’
ম্যাক্রোঁ বলেন, বিক্ষোভকারীদের যৌক্তিক দাবির সঙ্গে ভাঙচুর, ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখা যাবে না। তাঁর ভাষায়, কোনো কিছুই লাগামহীন সহিংসতাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং স্কুলসহ বিভিন্ন জনসেবার মানের অবনতির প্রতিবাদে শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়। আন্দোলনের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও একপর্যায়ে বেশ কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। এতে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
কালো পোশাক পরা এবং মুখোশ ও বালাক্লাভায় মুখ ঢাকা দাঙ্গাকারীরা প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষে জড়ায়। কোথাও কোথাও গাড়ি ও ভবনে আগুন দেওয়া হয়। প্যারিস ও লিওঁর কিছু এলাকায় রোববারও লুটপাট এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে আগের দিনের তুলনায় রোববারের সহিংসতা সীমিত ছিল।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিসে কয়েক শ মানুষের সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন পুলিশের দিকে বোতল ও পাথর নিক্ষেপ করেন।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। সহিংসতা মোকাবিলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় নির্ধারণে এ বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে লিমোজ শহরে। শনিবার দাঙ্গাকারীদের দেওয়া আগুনে শহরটির ঊনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী সিটি হলের বড় একটি অংশ পুড়ে যায়। আগুনের তীব্রতায় ভবনটির ঘড়ির টাওয়ার ও ছাদ ধসে পড়ে।
ধ্বংসস্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে অ্যানেইসে নামের এক নারী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত কষ্টের। সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ঐতিহ্যবাহী একটি ভবন ধ্বংস করাকে তিনি স্বার্থপরতার পরিচয় বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনায় সবারই ক্ষতি হচ্ছে।
জেরার্ড নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ঘটনাটি ভয়াবহ ও অবিশ্বাস্য। এ ঘটনায় তাঁরা গভীরভাবে দুঃখিত। ভবনটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে রোববার সকালে প্যারিসের বিভিন্ন দোকানের সামনে ছড়িয়ে থাকা কাচের বড় বড় টুকরা পরিষ্কার করতে দেখা যায় দোকানিদের। প্রধান সড়কগুলো থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও। প্যারিস, মার্সেই ও লিলসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।
দোকানপাট ও সরকারি ভবন রক্ষায় নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মেয়রদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
সপ্তাহান্তজুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা পুলিশের সদস্যদের লাঠি দিয়ে মানুষকে আঘাত করতেও দেখা গেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, শনিবারের সংঘর্ষে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর।
গত মাসে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শনিবার আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ওই দিন শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য এবং অন্যান্য সরকারবিরোধী গোষ্ঠীও আন্দোলনে যোগ দেয়। জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে বিক্ষোভের পরিধি বাড়তে থাকে।
আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, বিক্ষোভ করা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। তবে তাঁর অভিযোগ, কয়েক হাজার কট্টর বামপন্থী ব্যক্তি সরকারি ভবনকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর উদ্দেশ্যে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে তাঁদের সঙ্গে অপরাধী চক্র যুক্ত হয়, যারা বিভিন্ন শহরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়।
অন্যদিকে, বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশপ্রধানদের ‘সম্পূর্ণ অযোগ্যতা’র অভিযোগ তোলেন। তাঁদের ‘পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে বিশেষজ্ঞ’ বলেও কটাক্ষ করেন তিনি।
কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মারিন ল্য পেন অবশ্য সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু রাজনৈতিক শক্তি মানুষের ক্ষোভকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একদিকে বিক্ষোভকারীদের দাবিদাওয়া, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন—সব মিলিয়ে দেশটির সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।























