ফিলিস্তিনিদের জলপাই চুরির পক্ষে ইসরাইলি রাব্বির ফতোয়া
- আপডেট সময় ১০:১৬:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 19
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষকদের বাগান থেকে জলপাই তুলে নেওয়াকে বৈধতা দিয়ে ধর্মীয় ফতোয়া জারি করেছেন ইসরাইলের প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা রাব্বি ডোভ লিওর। ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে যেসব ফিলিস্তিনি কৃষক নিজেদের জলপাই সংগ্রহ করতে পারছেন না, তারা আগের বছরগুলোতে জলপাই ভোগ করার মাধ্যমে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি। তার এই বক্তব্যের পর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
শুক্রবার দেওয়া ফতোয়ায় ডোভ লিওর বলেন, ফিলিস্তিনি ভূমির ওপর ইহুদিদের মালিকানার দাবি রয়েছে। সেই যুক্তিতে ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের বাগান থেকে জলপাই তুলে নিতে পারবেন। পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদার ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা অব্যাহত থাকার মধ্যে তার এ বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
১৯৩৩ সালে পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই রাব্বি ফিলিস্তিনিদের বাগান থেকে জলপাই নেওয়াকে এক ধরনের ‘অতিরিক্ত পুণ্য’ বা মহৎ কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইহুদি বসতির বাইরের জমিও বসতি স্থাপনকারীদের দখলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, এর মাধ্যমে প্রকাশ্যে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা এবং বাইবেলের নির্দেশ অনুসরণ করা সম্ভব হবে।
ফতোয়ায় বলা হয়, ইহুদি জাতি কখনোই ইসরাইলের ভূমির ওপর থেকে দাবি প্রত্যাহার করেনি। রাব্বি লিওরের যুক্তি, আরবরা ইহুদি জাতি বা কোনো একক ইহুদির কাছ থেকে এসব জমি কেনেনি। তাই জমিগুলো ইহুদিদের মালিকানাধীন বলে দাবি করেন তিনি।
জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বেড়ে যাওয়ার মধ্যেই এই ফতোয়া এসেছে। গত শুক্রবার পশ্চিম তীরজুড়ে জলপাই সংগ্রহের সময় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের ৩৪টি হামলার ঘটনায় অন্তত ১৯ জন আহত হন।
এসব সহিংসতার খবর সংগ্রহের সময় ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর হয়ে কাজ করা এক মার্কিন ফটোসাংবাদিকও বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হন। এ ছাড়া ওই দিন পাঁচটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ইসরাইলি বিধিনিষেধ এবং বসতি স্থাপনকারীদের প্রাণঘাতী হামলার আশঙ্কায় বহু ফিলিস্তিনি কৃষক নিজেদের কৃষিজমিতে যেতে পারছেন না।
তবে ইহুদি ধর্মীয় নেতাদের সবাই ডোভ লিওরের বক্তব্য সমর্থন করেননি। গুশ এতজিওন বসতির ধর্মীয় কাউন্সিলের রাব্বিরা এক যৌথ চিঠিতে ফিলিস্তিনিদের ফসল অবৈধভাবে তুলে নেওয়াকে ‘চুরি’, ‘ধর্মদ্রোহিতা’ ও ‘নৈতিক অধঃপতন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রায় ৮০০ অর্থোডক্স রাব্বির সংগঠন ‘জোহার’ এক বিবৃতিতে বলেছে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কর্তৃত্ব কেবল রাষ্ট্রের রয়েছে। রাষ্ট্র যতক্ষণ জলপাইয়ের ওপর আরবদের মালিকানা স্বীকার করছে, ততক্ষণ সেগুলো তাদের সম্পত্তি।
ইসরাইলি রাজনীতির বিশ্লেষক মামুন আবু আমের আল জাজিরাকে বলেন, ডোভ লিওরের বক্তব্যের বিরোধিতা করা অন্য ধর্মীয় নেতাদের অবস্থানের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তার মতে, এসব নেতা রাজনৈতিক কৌশল বা সরকারের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলোর চাপের কারণে ফতোয়ার বিরোধিতা করে থাকতে পারেন। তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বোঝাতে চান, এ ধরনের বক্তব্য কয়েকজন চরমপন্থির বিচ্ছিন্ন অবস্থান, যা সাধারণ বসতি স্থাপনকারীদের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে না।
আবু আমের আরও বলেন, ইসরাইল সরকারও সহিংসতায় জড়িতদের সীমিত একটি গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ বসতি স্থাপনকারী শান্তিকামী ও আইন মেনে চলা নাগরিক। এভাবে সহিংসতার ঘটনাগুলোকে ‘হিলটপ ইউথ’ নামের একটি গোষ্ঠীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে ডোভ লিওরের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে ‘হিলটপ ইউথ’-এর সদস্যরা তার কঠোর ধর্মীয় নির্দেশনা অনুসরণ করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ভূমি নিয়ে যেকোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধী।
ডোভ লিওর ইসরাইলের ‘রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট’ আন্দোলনেরও একজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। তিনি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরের নেতৃত্বাধীন অতি-ডানপন্থি দল ‘ওতজমা ইহুদিত’ বা ‘জুয়িশ পাওয়ার’-এর আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে পরিচিত।
আবু আমেরের ভাষ্য, বেন-গাভির মূলত ডোভ লিওরের ধর্মীয় ফতোয়ার ওপর নির্ভর করেন, যেগুলো বাইবেলের বিভিন্ন বিষয়ের চরমপন্থি ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, টিকটক, প্রচারণামূলক কৌশল ও জনতুষ্টিবাদী বক্তব্যের মাধ্যমে বেন-গাভির রাজনৈতিক লড়াই চালাচ্ছেন। ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর ইসরাইলি সমাজে চরমপন্থার প্রতি বড় ধরনের সমর্থনের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যা তাকে ভোট পেতে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে, ইসরাইলি সংসদ নেসেটের বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির সদস্য গিলাদ কারিভ ডোভ লিওরের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, লিওর ও তার অনুসারীরা ইসরাইলকে চরম নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
কারিভ বলেন, এ বিষয়ে যারা নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছেন বা নীরব থাকছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে রাব্বি ডোভ লিওর ও তার অপরাধী চক্রের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছেন।






















