বিশ্বে ৬৪ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত, বছরে অপচয় ১০৫ কোটি টন খাবার
- আপডেট সময় ০৯:৪৯:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
- / 28
বিশ্বের একদিকে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছেন, অন্যদিকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত ছিলেন। অথচ জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) হিসাবে, ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে গৃহস্থালি, রেস্তোরাঁ ও দোকান থেকে অপচয় হয়েছে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার।
বিশ্বে পরিবেশন করা প্রতি পাঁচ প্লেট খাবারের প্রায় এক প্লেট শেষ পর্যন্ত অপচয় হচ্ছে। খাদ্যসংকটের পাশাপাশি খাবারের এমন অপচয় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে ক্ষুধার হার টানা তৃতীয় বছরের মতো কমেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মধ্যে ছিলেন। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।
তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মহামারির আগের সময়ের তুলনায় ক্ষুধার সংকট এখনো বেশি। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ বেশি ছিল।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি আফ্রিকায়। ২০২৫ সালে মহাদেশটিতে আনুমানিক ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছেন। অর্থাৎ আফ্রিকার প্রতি পাঁচজনের একজনের মতো মানুষ ক্ষুধার্ত ছিলেন। বিশ্বজুড়ে মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই আফ্রিকার বাসিন্দা।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১২২টি দেশকে নিয়ে করা তালিকায় আটটি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে রয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে সোমালিয়া। এরপর রয়েছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, চাদ ও মাদাগাস্কার। এ ছাড়া সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
খাদ্য অপচয় শুধু মানুষের খাবার ফেলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফসল কাটার পর থেকে বাজার ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়েও বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়।
এফএওর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল কাটার পর এবং খুচরা বিক্রির পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ফলমূল ও শাকসবজির অপচয়ের হার বেশি। বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হওয়া এসব খাবারের বার্ষিক আর্থিক মূল্য ৪০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।
অন্যদিকে, ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে গৃহস্থালি, রেস্তোরাঁ ও দোকান থেকে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার ফেলে দেওয়া হয়। ভোক্তা পর্যায়ে সহজলভ্য মোট খাবারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ছিল এই অপচয়ের পরিমাণ। এত বিপুল খাবার পরিবহনে ২০ টন ধারণক্ষমতার প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাক প্রয়োজন হতো।
বিশ্বে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ১৩২ কেজি খাবার অপচয় করেন। এর মধ্যে শুধু গৃহস্থালি পর্যায়েই নষ্ট হয় প্রায় ৭৯ কেজি।
তবে দেশভেদে খাবার অপচয়ের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, তুলনামূলক উষ্ণ দেশগুলোতে গৃহস্থালি পর্যায়ে খাবার অপচয়ের হার বেশি। তাজা খাবারের বেশি ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত হিমায়নব্যবস্থার অভাব এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ। দেশটিতে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার ফেলে দেন, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। তালিকায় এরপর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, সেশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে ব্যক্তিপ্রতি বছরে ২১০ কেজির বেশি খাবার অপচয় হয়।
অন্যদিকে, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা দেশগুলোর মধ্যে স্পেনে ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ সবচেয়ে কম। সেখানে একজন মানুষ বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তারও কম খাবার অপচয় করেন।
খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহে ব্যবহৃত অর্থ, জমি, পানি ও জ্বালানির বড় অংশ খাবার অপচয়ের সঙ্গে নষ্ট হয়। জাতিসংঘের হিসাবে, খাদ্য বিনষ্ট ও অপচয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিবছর এক লাখ কোটি ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়।
যেসব খাবার শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না, সেগুলো উৎপাদনে প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর জমি ব্যবহৃত হয়, যা বিশ্বের মোট কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ।
খাদ্য অপচয়ের পরিবেশগত প্রভাবও গুরুতর। ফেলে দেওয়া খাবার পচে মিথেন গ্যাস তৈরি করে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পচে যাওয়া খাবার থেকে উৎপন্ন মিথেনের কারণে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের সঙ্গে খাদ্য অপচয় সম্পর্কিত।
বিশ্ব খাদ্য দিবসে এসব পরিসংখ্যান আবারও সামনে এনেছে বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার বড় বৈপরীত্য—একদিকে কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধা, অন্যদিকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাবারের অপচয়। খাদ্যসংকট মোকাবিলায় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি অপচয় কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আল জাজিরা























