খামেনির উত্তরসূরি কে? আলোচনায় ছেলে মোজতবা খামেনি
- আপডেট সময় ০২:০২:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
- / 2
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন—তা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি।
প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় সংস্থা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে রয়েছে। পর্ষদের সদস্য আহমদ খাতামি বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, তারা যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে ভোটাভুটি সম্পন্ন করতে চান।
এই গুরুত্বপূর্ণ পদে মোজতবা খামেনির পাশাপাশি আরও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে আছেন দেশ পরিচালনাকারী অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের সদস্য আলিরেজা আরাফি, কট্টরপন্থী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মহসিন আরাকি এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য হাসান খামেনি, যিনি আয়াতুল্লাহ খামেনির নাতি।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি যদি এই পদে নির্বাচিত হন, তাহলে তা ইরানে ক্ষমতার এক ধরনের বংশানুক্রমিক হস্তান্তরের উদাহরণ হবে। যদিও ২০২৪ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিজেই এ ধরনের ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন। উল্লেখ্য, কয়েক শতাব্দী ধরে চলা শাহ শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
মোজতবা খামেনি ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পূর্ব ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রয়াত নেতার ছয় সন্তানের একজন। গত শনিবার তেহরানে যুদ্ধের শুরুর দিকে চালানো এক মার্কিন-ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
মোজতবা সাধারণত সরকারি অনুষ্ঠান বা গণমাধ্যমে খুব কমই দেখা দেন। ফলে পর্দার আড়ালে তার প্রভাব কতটা—তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ইরানিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা রয়েছে।
খামেনির সন্তানদের মধ্যে একমাত্র মোজতবাই আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি পদে না থেকেও জনপরিসরে পরিচিত। কাঁচা-পাকা দাড়ি ও কালো পাগড়ি পরিহিত এই ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে অনেকেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে মনে করেন। কালো পাগড়ি সাধারণত ‘সৈয়দ’ পরিচয়ের প্রতীক, অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধর।
ইরানের আদর্শিক সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে মোজতবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে একটি কমব্যাট ইউনিটে দায়িত্ব পালনকালে তার এই সম্পর্কের সূত্রপাত।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মোজতবা খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের দাবি ছিল, কোনো সরকারি পদে না থেকেও তিনি সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ খামেনি তার নেতৃত্বের কিছু দায়িত্ব ছেলের হাতে ন্যস্ত করেছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আঞ্চলিক কৌশল ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতিতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন।
বিরোধী গোষ্ঠীর অভিযোগ, ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর যে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দমনে মোজতবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অন্যদিকে ব্লুমবার্গের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মোজতবা খামেনির সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি ডলারের বেশি। বিভিন্ন বেনামী সূত্র ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, তেল বিক্রির অর্থ কর ফাঁকি দিতে বিদেশে পাচার করে তা দিয়ে ব্রিটেনে বিলাসবহুল বাড়ি, ইউরোপে হোটেল এবং দুবাইয়ে সম্পত্তি কেনা হয়েছে।
মোজতবা তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত পবিত্র শহর কোমে ধর্মতত্ত্বে পড়াশোনা ও শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ পদমর্যাদা অর্জন করেছেন, যা ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধির নিচের স্তর।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় মোজতবার স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেলও নিহত হয়েছেন। তিনি ইরানের সাবেক এক পার্লামেন্ট স্পিকারের কন্যা ছিলেন।
এদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরাইল কাটজ সতর্ক করে বলেছেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির যে-ই উত্তরসূরি হন না কেন, তাকে তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এ মোট ৮৮ জন সদস্য রয়েছেন, যারা আট বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর এই পর্ষদই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছিল। এরপর এটাই প্রথমবার, যখন নতুন নেতা নির্বাচনের বিষয়টি সামনে এসেছে।



















