ঢাকা ১২:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

তিন লক্ষ্য নিয়ে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:৪৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / 19

ছবি: সংগৃহীত

 

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো এবং দেশে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ—এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এ সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ইপিএ কার্যকরের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে টয়োটার গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপন, জাপানের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সফরে জাপানের সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হবে। তবে সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে ইপিএ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো।

আরও পড়ুন  নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানকে র‍্যাঙ্ক ব্যাজ পরালেন প্রধানমন্ত্রী

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (এফটিএ-১ অধিশাখা) মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই চুক্তিটি করা হয়েছে।

তিনি জানান, আগামী সংসদ অধিবেশনে ইপিএ অনুমোদন হতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সামনে রেখে চুক্তিটিকে দুই দেশের জন্যই সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় এলেও ইপিএ বাস্তবায়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইপিএ কার্যকর করার প্রস্তুতির পাশাপাশি এর আওতায় থাকা সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সফরকালে ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান। সেখানে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা। প্রতিষ্ঠানটি দেশে গাড়ি উৎপাদন শুরু করলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

এর আগে ৬ অক্টোবর টয়োটা তসুশো করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিতানির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে টয়োটার গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানায়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছে।

ইপিএর আওতায় জাপানি গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যের শুল্কসংক্রান্ত সুবিধা এবং বিনিয়োগের নিয়ম সহজ করার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, জাপানি গাড়ি বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশের তালিকায় না থাকায় স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনে বিনিয়োগের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

টয়োটার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এরই মধ্যে জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন বাংলাদেশের রানকন অটো ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। এসব উদ্যোগের ফলে জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের বিনিয়োগের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিটি গত ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে সই হয়। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া আলোচনা শেষে সম্পাদিত এ চুক্তিকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ৯৭ শতাংশ বা ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে।

তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর জন্য এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। এ ছাড়া অন্যান্য অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ১৮ বছর পর্যন্ত শুল্ক কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

ইপিএ কেবল শুল্ক কমানোর চুক্তি নয়। এতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্য সহজীকরণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নীতিমালা ও নিয়মকানুন সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

সংসদীয় অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া শেষ হলে চুক্তিটি কার্যকরের পথ সুগম হবে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে ইপিএ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য চুক্তিতে থাকা সুবিধাগুলো কার্যকর করার বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ানোও সফরের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে প্রায় ১১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি আয় ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি।

এলডিসি উত্তরণের পরও পরবর্তী তিন বছর বাংলাদেশের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার কথা জানিয়েছে জাপান। দেশটির বার্ষিক পোশাক আমদানির বাজার প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের। ফলে এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।

ইপিএর আওতায় শুল্ক সুবিধা অব্যাহত থাকলে জাপানের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিট ও ওভেন পোশাক, ডেনিম, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের বাজারও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, জাপানি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করাই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিজিএমইএ গত মাসে উত্তরায় তাদের কার্যালয়ে ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করেছে।

এ ছাড়া এশীয় পোশাক ব্র্যান্ডগুলোকে আকৃষ্ট করতে আগামী মাসে হংকংয়ে একটি রোডশোর আয়োজন করা হচ্ছে। এতে জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে সরকারের। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদে প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাবের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্যাকেজে সহজ শর্তের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সমন্বয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবহন অবকাঠামো, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বন্দর, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়ন করা গেলে রপ্তানিমুখী শিল্পের পণ্য পরিবহন সহজ হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য পৌঁছানোর সুযোগও বাড়তে পারে।

জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত মেট্রোরেল ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্প দুই দেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার উদাহরণ। প্রধানমন্ত্রীর সফরে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, নতুন অর্থায়ন এবং জাপানি ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময় দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী ঢাকায় থাকবেন। ইতোমধ্যে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের কূটনৈতিক বিষয়গুলো তদারকি এবং সার্বিক আয়োজন সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ক সচিব এম নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। সফর চলাকালে তিনি সেখানে অবস্থান করবেন এবং দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে প্রধান ভূমিকা পালন করবেন।

সূচি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ বাস্তবায়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

তিন লক্ষ্য নিয়ে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

আপডেট সময় ১০:৪৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

 

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো এবং দেশে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ—এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এ সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ইপিএ কার্যকরের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে টয়োটার গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপন, জাপানের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সফরে জাপানের সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হবে। তবে সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে ইপিএ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো।

আরও পড়ুন  দোভালের কথিত গোপন ঢাকা সফর নিয়ে প্রশ্ন

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (এফটিএ-১ অধিশাখা) মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই চুক্তিটি করা হয়েছে।

তিনি জানান, আগামী সংসদ অধিবেশনে ইপিএ অনুমোদন হতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সামনে রেখে চুক্তিটিকে দুই দেশের জন্যই সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় এলেও ইপিএ বাস্তবায়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইপিএ কার্যকর করার প্রস্তুতির পাশাপাশি এর আওতায় থাকা সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সফরকালে ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান। সেখানে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা। প্রতিষ্ঠানটি দেশে গাড়ি উৎপাদন শুরু করলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

এর আগে ৬ অক্টোবর টয়োটা তসুশো করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিতানির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে টয়োটার গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানায়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছে।

ইপিএর আওতায় জাপানি গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যের শুল্কসংক্রান্ত সুবিধা এবং বিনিয়োগের নিয়ম সহজ করার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, জাপানি গাড়ি বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশের তালিকায় না থাকায় স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনে বিনিয়োগের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

টয়োটার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এরই মধ্যে জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন বাংলাদেশের রানকন অটো ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। এসব উদ্যোগের ফলে জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের বিনিয়োগের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিটি গত ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে সই হয়। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া আলোচনা শেষে সম্পাদিত এ চুক্তিকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ৯৭ শতাংশ বা ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে।

তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর জন্য এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। এ ছাড়া অন্যান্য অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ১৮ বছর পর্যন্ত শুল্ক কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

ইপিএ কেবল শুল্ক কমানোর চুক্তি নয়। এতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্য সহজীকরণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নীতিমালা ও নিয়মকানুন সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

সংসদীয় অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া শেষ হলে চুক্তিটি কার্যকরের পথ সুগম হবে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে ইপিএ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য চুক্তিতে থাকা সুবিধাগুলো কার্যকর করার বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ানোও সফরের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে প্রায় ১১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি আয় ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি।

এলডিসি উত্তরণের পরও পরবর্তী তিন বছর বাংলাদেশের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার কথা জানিয়েছে জাপান। দেশটির বার্ষিক পোশাক আমদানির বাজার প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের। ফলে এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।

ইপিএর আওতায় শুল্ক সুবিধা অব্যাহত থাকলে জাপানের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিট ও ওভেন পোশাক, ডেনিম, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের বাজারও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, জাপানি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করাই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিজিএমইএ গত মাসে উত্তরায় তাদের কার্যালয়ে ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করেছে।

এ ছাড়া এশীয় পোশাক ব্র্যান্ডগুলোকে আকৃষ্ট করতে আগামী মাসে হংকংয়ে একটি রোডশোর আয়োজন করা হচ্ছে। এতে জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে সরকারের। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদে প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাবের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্যাকেজে সহজ শর্তের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সমন্বয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবহন অবকাঠামো, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বন্দর, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়ন করা গেলে রপ্তানিমুখী শিল্পের পণ্য পরিবহন সহজ হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য পৌঁছানোর সুযোগও বাড়তে পারে।

জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত মেট্রোরেল ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্প দুই দেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার উদাহরণ। প্রধানমন্ত্রীর সফরে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, নতুন অর্থায়ন এবং জাপানি ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময় দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী ঢাকায় থাকবেন। ইতোমধ্যে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের কূটনৈতিক বিষয়গুলো তদারকি এবং সার্বিক আয়োজন সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ক সচিব এম নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। সফর চলাকালে তিনি সেখানে অবস্থান করবেন এবং দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে প্রধান ভূমিকা পালন করবেন।

সূচি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ বাস্তবায়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।