ক্ষমতার চাবিকাঠি এবার নারী ভোটারের হাতে
- আপডেট সময় ০১:১৮:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 60
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের বাকি আর মাত্র তিন দিন। অথচ ভোটারদের মন বোঝা দায়। এক অদ্ভুত নীরবতা পালন করছেন তারা। তারুণ্যের ভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তুমুল আলোচনা থাকলেও, বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। এবারের নির্বাচনের আসল ‘গেম চেঞ্জার’ বা ভাগ্যনির্ধারক হতে যাচ্ছেন দেশের নারী ভোটাররা। রাজনৈতিক দলগুলোর গালভরা প্রতিশ্রুতি নাকি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা–কোনটি প্রাধান্য পাবে নারীর ব্যালটে, তাঁর ওপরই নির্ভর করছে আগামী ক্ষমতার মসনদ।
নারী ভোটারের শক্তি
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৯.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ জনসংখ্যার অর্ধেক এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো দলের পক্ষেই এককভাবে সরকার গঠন করা গাণিতিকভাবেই অসম্ভব।
অথচ পরিসংখ্যানের এই শক্তির বিপরীতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের চিত্রটি হতাশাজনক। ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নে অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারীপ্রার্থী মাত্র ৮০ জন (৪.০৪ শতাংশ)। দলীয় মনোনয়নে এই হার আরও কম, মাত্র ৩.৩৮ শতাংশ।
অতীত যখন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নারীরা যেদিকে ঝুঁকেছেন, বিজয়ের মালা তাদের গলায়ই উঠেছে। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনগুলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
১৯৯১: বিএনপি ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে, যেখানে নারী ভোটের ৫৭ শতাংশ ছিল তাদের বাক্সে।
১৯৯৬: নারী ভোটে বিএনপির ধস নামে (৩৫ শতাংশে নেমে আসে)। ফলে পুরুষ ভোটে খুব বেশি পিছিয়ে না থেকেও বিএনপি বিরোধী দলে চলে যায় এবং আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।
২০০১: আবারও নারী ভোটাররা বিএনপির দিকে ঝোঁকেন (৫৭ শতাংশ), যা দলটিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরুষ ভোটার বা তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভাজন প্রকট। বিশেষ করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র সমাজের বিভক্তি স্পষ্ট। কিন্তু নারীদের ভোটিং প্যাটার্ন বা মনস্তত্ত্ব অনেকটাই এক। গ্রামীণ গৃহিণী থেকে শহুরে কর্মজীবী–নারীর নিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্যের মতো মৌলিক ইস্যুতে তারা প্রায় অভিন্ন চিন্তা করেন।
প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চায় নারী
নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটাচ্ছে, তখন নারীরা চাইছেন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। মাঠ পর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারীরা এখন আর চটকদার স্লোগানে বিশ্বাসী নন। গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা তাসলিমা আক্তারের মতে, ‘মজুরি বৈষম্য দূর করা এবং কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আইন আছে, কিন্তু সংসদ কার্যকর না হলে তার সুফল মিলবে না।’ বাস্তব অনুসন্ধানে দেখা যায়, কর্মজীবী নারীর সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার বা দিবাযত্ন কেন্দ্রই শুধু নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর স্থান বা ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের অভাব এখনও প্রকট।
গৃহকর্মী শিউলি বেগমের আক্ষেপ, ‘সবাই এগিয়ে যায়, কিন্তু আমাদের মতো ২৫ লাখ গৃহশ্রমিকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। টিসিবির পণ্যও আমরা পাই না।’
শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মজীবী নারীদের মূল দাবি এখন ‘নিরাপত্তা’। হলি ক্রস স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিয়া জানায়, ‘স্কুলে যেতে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। বখাটেদের ভয় বা হয়রানি যেন বন্ধ হয়।’
রাজনৈতিক দলের তোড়জোড় ও বিতর্ক
বিশাল নারী ভোটব্যাংক নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছে। এনসিপি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশের।
তবে এর মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে করা একটি পোস্ট (যা পরে হ্যাকড হয়েছে বলে দাবি করা হয়) নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনাটি প্রমাণ করে, নারীবিদ্বেষী মনোভাব বা মন্তব্য এবারের নির্বাচনে কতটুকু স্পর্শকাতর ইস্যু হতে পারে। একশনএইডের ফারাহ্ কবিরের মতে, নারীকে কেবল ভোটব্যাংক ভাবলে ভুল হবে; তাদের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
নীরব বিপ্লবের অপেক্ষা
২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীর অসামান্য অবদান ছিল। কোটা সংস্কার থেকে শুরু করে স্বৈরাচার পতন–রাজপথে নারীরা ছিলেন অগ্রভাগে। আন্দোলনের পর নারীর নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতা কমেনি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে।
নারী ভোটাররা এখন মুখ খুলছেন না, তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। অতীত ইতিহাস এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট বলছে, রাজনৈতিক দলগুলোর ভাগ্য এই ছয় কোটি ২৮ লাখ নারীর হাতেই বন্দি। তারা ভুল করেন না এবং আবেগের চেয়ে জীবনের বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়েই তারা সিদ্ধান্ত নেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বাক্সে সেই সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটবে, যা নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ। তবে গণতন্ত্রের অর্থ কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্রের সার্থকতা তখনই যখন সরকারব্যবস্থা ও শাসনব্যবস্থায় নারীসহ সবার সুষ্ঠু অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।

















